প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৪:০০ পিএম
তেহরানের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিচুক্তি নিয়ে যখন কূটনৈতিক তৎপরতায় ব্যস্ত ছিল ওয়াশিংটন, ঠিক সেই সময় ইরানের দুই শীর্ষ আলোচককে ঘিরে সম্ভাব্য ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহলে। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা ছিল, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা হলে চলমান সংবেদনশীল যুদ্ধবিরতি আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে যেতে পারে। এ কারণে ওয়াশিংটন আঞ্চলিক মিত্রদেরও তাদের নিরাপত্তা বিষয়ে সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছিল বলে জানা গেছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধের শুরুর দিক থেকেই ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে টার্গেট করা ছিল ইসরায়েলের সামরিক কৌশলের একটি বড় অংশ। যদিও যুদ্ধের তীব্রতম সময় আরাগচি ও গালিবাফকে ‘বৈধ’ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, তবু আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তাদের হত্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারত বলে আশঙ্কা ছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের মাধ্যমে সংঘাতের সূচনা হয়। আংশিকভাবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত ওই অভিযানে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ইরানের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এরপর থেকেই অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়।
মার্কিন ও মধ্যপ্রাচ্যের কর্মকর্তাদের দাবি, ইসরায়েলের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় কেবল আরাগচি ও গালিবাফই ছিলেন না; সেখানে ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি ও জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানির নামও ছিল। এঁদের অনেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য আলোচনার অংশীদার হিসেবে বিবেচিত ছিলেন।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের লক্ষ্য ধীরে ধীরে ভিন্ন পথে যেতে শুরু করে। ওয়াশিংটন যেখানে শান্তিচুক্তির মাধ্যমে উত্তেজনা কমাতে আগ্রহী ছিল, সেখানে ইসরায়েল শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন, প্রক্সি বাহিনী ধ্বংস এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দুর্বল করার মতো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছিল।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক রূপরেখা চুক্তি হয়, যা হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনার পথও উন্মুক্ত করে। তবে এই চুক্তিকে ইসরায়েলি মহল ‘অপূর্ণ’ ও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে দেখছে।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অন্যদিকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।’
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তাঁর মেয়েজামাই জ্যারেড কুশনার কাতারে ফলপ্রসূ বৈঠক করেছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান, শান্তি প্রক্রিয়াটি ‘চলুক’।’
এদিকে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনায় অংশ নিতে গিয়ে আরাগচি ও গালিবাফকে একাধিকবার গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়েছে। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগও করেছিল তেহরান।
ইরানি পার্লামেন্ট সদস্য মহসেন জাঙ্গানেহ এ বিষয়ে বলেন, ‘আজ গালিবাফ, আরাগচি এবং আলোচক দলের অন্য সদস্যরা গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকির কথা জেনেও তাঁদের জীবন বাজি রেখেছেন। একে রাজনৈতিক চালবাজি নয়, বরং প্রকৃত এক আত্মত্যাগ বলা যায়।’
সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ইরানের শীর্ষ আলোচকেরা কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে গেছেন। মে মাসের শেষ দিকে তাঁরা কাতারে এবং পরে জুনে সুইজারল্যান্ডে গিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই ঘটনাপ্রবাহ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—শান্তির টেবিল ও যুদ্ধক্ষেত্রের সীমারেখা কতটা নিরাপদ?
