শুক্রবার ০৩, জুলাই ২০২৬

শুক্রবার ০৩, জুলাই ২০২৬ -- : -- --

আর্জেন্টিনা-মেসির প্রেমে বাংলাদেশ, ফুটবল আবেগে জেগে থাকে পুরো দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম

আর্জেন্টিনা-মেসির প্রেমে বাংলাদেশ, ফুটবল আবেগে জেগে থাকে পুরো দেশ

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ যেন রঙ বদলায়। শহরের অলিগলি, ছাদ, দেয়াল, ক্যাম্পাস সবখানেই দেখা যায় আকাশি-সাদা পতাকার ঢেউ। ফিফা বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কখনো জায়গা না পেলেও আর্জেন্টিনা মাঠে নামলেই দেশের ফুটবলপ্রেমীরা যেন নিজেদের দলকেই দেখতে পান।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকের পর সেই চিত্রই আবারও দেখা গেল রাজধানী ঢাকায়। বড় পর্দার সামনে হাজারো সমর্থকের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ‘আর্জেন্টিনা! আর্জেন্টিনা! মেসি! মেসি!’ ভুভুজেলার শব্দ আর উল্লাসে চারপাশ যেন পরিণত হয়েছিল এক টুকরো বুয়েনস এইরেসে।

বিশ্বকাপের প্রতি চার বছরের অপেক্ষা বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের জন্য যেন এক মহাউৎসব। পাড়া-মহল্লায় বড় পর্দায় খেলা দেখা, ছাদে ছাদে পতাকা ওড়ানো, রাস্তাজুড়ে মিছিল সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার প্রতিটি ম্যাচকে ঘিরে তৈরি হয় অন্যরকম এক আবহ।

ঢাকার ৫০ বছর বয়সী আবদুল হাইয়ের মতো অনেকের আর্জেন্টিনাপ্রীতির শুরু ডিয়েগো ম্যারাডোনার সময় থেকে। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ই তাঁর মতো অনেককে এই দলের সমর্থকে পরিণত করে। আবদুল হাই বলেন, ‘আমি ১৯৮৬ সালেই ম্যারাডোনার “প্রেমে” পড়ে যাই। তখন খুব ছোট ছিলাম। কিন্তু নিজের চোখে দেখেছি, মানুষ তাঁর জন্য কতটা পাগল ছিল। তাঁর খেলার ধরন, আবেগ, দক্ষতা এমনকি “হ্যান্ড অব গড” গোল সবকিছুই আমাদের এমনভাবে মুগ্ধ করেছিল, যা অন্য কোনো কিছু পারেনি। তিনি আমাদের কাছে কিংবদন্তি ও এক বিস্ময় হয়ে উঠেছিলেন।’

ম্যারাডোনার পর ২০২২ সালে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় সেই আবেগকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। আবদুল হাইয়ের ভাষায়, ‘কিন্তু অপেক্ষাটা সার্থক ছিল। মেসির হাতে বিশ্বকাপের ট্রফি দেখার পর ফুটবল নিয়ে আমার আর কোনো আক্ষেপ নেই। এবার আমি আগের বিশ্বকাপগুলোর মতো উদ্বেগ নিয়ে নয়, বরং অনেক আনন্দ নিয়ে বিশ্বকাপ দেখছি।’

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ও কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক মনে করেন, বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থনের মূল শেকড় ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপেই। তাঁর মতে, ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক জয় এবং ম্যারাডোনার অসাধারণ পারফরম্যান্স দেশের ফুটবলপ্রেমীদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

এই সমর্থন কেবল খেলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা কূটনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। ২০২২ বিশ্বকাপে বাংলাদেশিদের উন্মাদনা বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ৪৫ বছর পর ২০২৩ সালে ঢাকায় পুনরায় দূতাবাস চালু করে Argentina।

নতুন প্রজন্মের কাছে অবশ্য ম্যারাডোনার চেয়ে বেশি প্রিয় Lionel Messi। ঢাকার এক সমর্থক দ্বীন ইসলাম বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি আর্জেন্টিনার ভক্ত। আর এর একমাত্র কারণ লিওনেল মেসি।’

এই ভালোবাসা অনেকের কাছে পারিবারিক উত্তরাধিকারও। সমর্থক মোহাম্মদ জহির বলেন, ‘আমার বাবা আর্জেন্টিনার কট্টর ভক্ত ছিলেন। বাবার কাছ থেকেই আমি এই দলের প্রতি ভালোবাসা পেয়েছি। এরপর যখন নিজে ফুটবল বুঝতে শুরু করলাম, তখন দলটির খেলার নান্দনিক শৈলী দেখে চিরদিনের জন্য প্রেমে পড়ে গেলাম।’

তবে এই উন্মাদনার ভেতরেও বড় এক আক্ষেপ আছে। বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশিদের উন্মাদনা থাকলেও দেশের নিজস্ব ফুটবল সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। ক্রীড়া সাংবাদিক শাহনূর রব্বানী বলেন, ফুটবলপ্রেম আছে, কিন্তু নেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অবকাঠামো কিংবা যথেষ্ট বিনিয়োগ।

তিনি বলেন, ‘ওদের এই বাঁধভাঙা উল্লাস দেখলে আমার যেমন ভীষণ আনন্দ হয়, ঠিক তেমনি একধরনের কষ্ট অনুভব করি। কারণ, আমাদের এত আবেগ ও ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও আমাদের ফুটবল দল এবং সামগ্রিকভাবে দেশের খেলাধুলা যে অবস্থানে থাকার কথা ছিল, তার ধারেকাছেও নেই।’

বর্তমান বিশ্বকাপে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে রাউন্ড অব ৩২-এ জায়গা করে নিয়েছে Argentina national football team। ৪ জুলাই বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় কেপ ভার্দের মুখোমুখি হবে মেসির দল। আর সেই ম্যাচ ঘিরে আবারও জেগে থাকবে বাংলাদেশ আবেগে, উল্লাসে, আর এক অদ্ভুত আত্মপরিচয়ে যেখানে আর্জেন্টিনার জয় মানেই যেন ‘আমাদের’ জয়।

Link copied!