বুধবার ২৯, এপ্রিল ২০২৬

বুধবার ২৯, এপ্রিল ২০২৬ -- : -- --

বন্যার আগাম পূর্বাভাস দিবে বাকৃবি গবেষকদের যুগান্তকারী উদ্ভাবন

বাকৃবি থেকে মুহাম্মদ সোহান

প্রকাশিত: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল ইসলাম । ফাইল ফটো

বাংলাদেশের মতো বন্যাপ্রবণ দেশে নদীর পানির উচ্চতা আগাম ও নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা দীর্ঘদিনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে পর্যাপ্ত তথ্য বা উপাত্তের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এই সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে। এমন বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি কার্যকর বন্যা পূর্বাভাস মডেল তৈরি করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।

এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন বাকৃবির সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল ইসলাম। গবেষক দলে আরও ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. আদহামসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা।

গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (এমওএসটি) এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম (বাউরেস) প্রকল্প বাস্তবায়নে কারিগরি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রদান করেছে।

গবেষণার কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এবং ১৯৯৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ২৬ বছরের আবহাওয়া ও নদ-নদীর তথ্য বিশ্লেষণ করে এই মডেলটি তৈরি করা হয়েছে। গবেষণাটি ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক মানের কিউ১-কিউ২ জার্নালে প্রকাশিত হয়।

গবেষণার মূল উদ্ভাবন হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নদীর পানির উচ্চতা আগাম পূর্বাভাস দেওয়া। এ জন্য পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের ইসলামপুর, সরিষাবাড়ী, দেওয়ানগঞ্জ ও ময়মনসিংহ স্টেশন থেকে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষকরা একাধিক এআই মডেল প্রয়োগ করে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন।

গবেষণার লক্ষ্য ছিল বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, পানির উচ্চতা এবং প্রবাহের হার—এই ধরনের আবহাওয়াগত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে পানির স্তর কতটা বাড়বে বা কমবে তা নির্ণয় করা। প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এই নতুন প্রযুক্তি কম তথ্য ব্যবহার করেও অত্যন্ত নির্ভুল ফলাফল দিতে সক্ষম হয়েছে।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, অতীতের পানির উচ্চতার তথ্য ব্যবহার করে র‍্যান্ডম ফরেস্ট (আরএফএম) মডেল ৯৯.১৬ শতাংশ পর্যন্ত নির্ভুলতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে তথ্য স্বল্পতার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করে ডিপ লার্নিংভিত্তিক এলএসটিএম মডেল ৮১.৪৫ শতাংশ পর্যন্ত সঠিক পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হয়েছে। পাশাপাশি এসভিএম মডেলও এ গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে।

গবেষকরা জানান, এই প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করা গেলে কৃষকরা সরাসরি উপকৃত হবেন। বন্যার আগাম পূর্বাভাস পেলে কৃষকরা আগে থেকেই পাকা ফসল ঘরে তুলতে পারবেন, গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পারবেন এবং সেচ ব্যবস্থাপনায় সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারবেন। ফলে সম্ভাব্য বড় আর্থিক ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এটি একটি সফটওয়্যারভিত্তিক প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন হওয়ায় ব্যবহারকারীদের জন্য কোনো অতিরিক্ত খরচের প্রয়োজন হবে না। গবেষকদের আশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও কারিগরি সহায়তা পেলে এই মডেলকে জাতীয় পর্যায়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে মোবাইল অ্যাপ বা বার্তার মাধ্যমে কৃষকদের কাছে এই সেবা সহজেই পৌঁছে দেওয়া যাবে বলেও তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

Link copied!