প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার এক কোণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে এক অনন্য ঐতিহ্য—সুরের সঙ্গে জীবনের বন্ধন। ব্রিটিশ আমলে যার সূচনা, সেই দাস পরিবারের উত্তরাধিকার এখনো বহন করে চলেছেন তাদের উত্তরসূরিরা।
এই ধারার প্রবর্তক বঙ্কু চন্দ্র দাস ছিলেন একাধারে সংগীতশিল্পী ও বাদ্যযন্ত্র নির্মাতা। শুধু বাজানো নয়, বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও মেরামতে তাঁর দক্ষতা ছিল অসাধারণ। তাঁর হাত ধরেই পরিবারে গড়ে ওঠে এক বিশেষ পরিচয়—‘সুরের কারিগর’ হিসেবে।
পরবর্তীতে তাঁর ভাই-বোনদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে এই পেশা ও সংস্কৃতি। দোতারা, ঢোল, ডুগি তবলা কিংবা হারমোনিয়াম—এসব বাদ্যযন্ত্র শুধু জীবিকার মাধ্যম ছিল না, বরং ছিল তাদের পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে গ্রামীণ জীবনে বিনোদনের ধরন বদলে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের চাহিদা কমে আসে। তবুও দাস পরিবার তাদের পেশা ও ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
এই পরিবারের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব মন্টু চন্দ্র দাস, যিনি দীর্ঘ প্রায় ৭৫ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভাঙা বাদ্যযন্ত্রে নতুন সুর ফিরিয়ে আনা ছিল তাঁর নিত্যদিনের কাজ। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় যেন নিস্তেজ যন্ত্রগুলো আবার প্রাণ ফিরে পেত।
তবে সময়ের বাস্তবতায় তিনি দেখেছেন, নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই পেশার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সাউন্ডের প্রভাব ঐতিহ্যবাহী সুরের জায়গা সংকুচিত করছে।
বর্তমানে এই ঐতিহ্যের ভার বহন করছেন তাঁর ছেলে আনন্দ চন্দ্র দাস। ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছ থেকে হাতে-কলমে শেখা দক্ষতায় তিনি এখনো দোতারা, হারমোনিয়াম, ডুগি তবলা, ঢোল ও ড্রাম মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে আগের মতো কাজের চাপ আর নেই। অনেকেই নতুন যন্ত্র কিনতে আগ্রহী হওয়ায় পুরোনো যন্ত্র মেরামতের চাহিদা কমে গেছে। তবুও নিজের শিকড় ও পরিচয়ের টানে তিনি এই পেশা ছেড়ে যাননি।
দাস পরিবারের এই গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। যেখানে পেশা মানে শুধু জীবিকা নয়, একটি ঐতিহ্য ও জীবনদর্শনের বহিঃপ্রকাশ।
তবে এই ঐতিহ্য এখন ঝুঁকির মুখে। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা পেলে এমন কারিগরদের মাধ্যমে এই সুরের ধারা টিকে থাকতে পারে।
পীরগঞ্জের দাস পরিবারের গল্প তাই মনে করিয়ে দেয়—ঐতিহ্য শুধু অতীত নয়, এটি বর্তমানের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও বটে।
