শুক্রবার ১৭, এপ্রিল ২০২৬

শুক্রবার ১৭, এপ্রিল ২০২৬ -- : -- --

বৈসাবিতে রঙিন পাহাড়,শুরু হলো তিন দিনের উৎসব

স্বর্ণক শাহী

প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩২ এএম

ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে শুরু হয়েছে বছরের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসব ‘বৈসাবি’কে ঘিরে প্রস্তুতি। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে এই উৎসব পরিণত হয় এক বর্ণাঢ্য মিলনমেলায়, যেখানে পুরনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করা হয় আনন্দ, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে।

‘বৈসাবি’ শব্দটি এসেছে তিনটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর উৎসবের নামের আদ্যক্ষর থেকে—ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ এবং চাকমাদের ‘বিজু’। তবে এ তিন সম্প্রদায়ের পাশাপাশি তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রোসহ অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীরাও নিজ নিজ সংস্কৃতির আলোকে এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে। ফলে বৈসাবি শুধু একটি উৎসব নয়, বরং পার্বত্য অঞ্চলের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

উৎসবকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ইতোমধ্যেই সেজে উঠেছে নতুন সাজে। বাজারগুলোতে বেড়েছে কেনাকাটার ভিড়, ঘরে ঘরে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সাজসজ্জার কাজ। তরুণ-তরুণীরা ব্যস্ত ঐতিহ্যবাহী পোশাক প্রস্তুতিতে, আর প্রবীণরা ব্যস্ত উৎসবের আচার-অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতিতে।

তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের প্রথম দিন ‘ফুল বিজু’ পালনের মাধ্যমে সূচনা হয়। এদিন ভোরে নদী বা জলাশয়ে ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনা করা হয় এবং ঘরবাড়ি ফুল দিয়ে সাজানো হয়। এটি পবিত্রতা ও শুভ সূচনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। দ্বিতীয় দিন ‘মূল বিজু’-তে ঘরে ঘরে রান্না করা হয় ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘পাচন’, যা বিভিন্ন প্রকার সবজি দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। আত্মীয়-স্বজনদের আপ্যায়ন এবং বড়দের কাছ থেকে আশীর্বাদ গ্রহণ এ দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তৃতীয় দিন ‘বিসি কতাল’ বা ‘গোজ্যেপোজ্যে দিন’-এ নতুন পোশাক পরে মন্দিরে প্রার্থনা করা হয় এবং সবাই মিলে আনন্দ ভাগাভাগি করা হয়।

উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ মারমা সম্প্রদায়ের ‘জলকেলি’ বা পানি খেলা, যেখানে তরুণ-তরুণীরা একে অপরের ওপর পানি ছিটিয়ে আনন্দ উদযাপন করে। এ আয়োজনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তৈরি হয় উচ্ছ্বাস ও প্রাণচাঞ্চল্য।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বৈসাবি শুধু আনন্দ-উৎসব নয়; এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরিচয় রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একই সঙ্গে এটি পারস্পরিক সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদার করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈসাবির মতো উৎসবগুলো দেশের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে এবং জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতি বছর এ উৎসব দেশ-বিদেশের পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এদিকে নিরাপদ ও সুষ্ঠুভাবে উৎসব উদযাপনে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আশা করা হচ্ছে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদযাপনের মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলে সম্প্রীতির বার্তা আরও জোরদার হবে।

Link copied!