সোমবার ১৯, অক্টোবর ২০২৬

সোমবার ১৯, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

শামীম হত্যা মামলায় প্রধান আসামি আমিনী কারাগারে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩০ পিএম

সাতক্ষীরায় শামীম হত্যা: ‘অ্যাক্সিডেন্টে হয়ে গেছে’, দাবি প্রধান আসামি আমিনীর

সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী ঘটনাটিকে ‘অ্যাক্সিডেন্ট’ বলে দাবি করেছেন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, আইনের দৃষ্টিতে তিনি অপরাধী। আজ রোববার বেলা তিনটার দিকে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদস্যরা তাঁকে সদর থানায় নিয়ে আসার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

থানা ভবনে প্রবেশের আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফজলুল হক আমিনী বলেন, ‘আইনের দৃষ্টিতে আমি অপরাধী। আমি যে কাজটি করেছি, আপনারা দেখছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, এটা আল্লাহপাক ফয়সালা করবেন।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে আমিনী বলেন, ‘পিটিয়ে মারার তো ওয়ে (উদ্দেশ্য) ছিল না, হয়ে গেছে অ্যাক্সিডেন্টে। আইনের দৃষ্টিতে আমি অপরাধী, তবে এমনিতে নিজেকে অপরাধী মনে করি না।’

অভিযোগ রয়েছে, শামীমকে মারধরের আগে আমিনী ফেসবুকে দুই দফা লাইভ সম্প্রচার করে লোকজন জড়ো করেন। পরে দফায় দফায় মারধরের পর শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর মরদেহের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন আমিনী।

কারাগারে পাঠানো হয়েছে আমিনীকে

গতকাল শনিবার রাত ১১টার দিকে জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও এসআরবি-৬। আজ রোববার বেলা তিনটার দিকে তাঁকে সাতক্ষীরা সদর থানায় নেওয়া হয়। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, ফজলুল হক আমিনী পুলিশের কাছে শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন বলেও জানিয়েছেন। এ কারণে তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি পুলিশ। আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

যেভাবে প্রাণ হারান শামীম

গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শামীমের একটি অডিও কথোপকথন ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে—এমন অভিযোগ ওঠার পর তাঁর বাড়িতে হামলার চেষ্টা হয়। একই দিন স্থানীয় একটি বাজারে শামীমকে প্রথম দফায় মারধর করা হয়।

এরপর শামীম বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। স্বজনেরা তাঁকে স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে চিকিৎসা করান। পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে একদল লোক ওই চেম্বার থেকে তাঁকে বের করে আবার মারধর করেন। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই রাতেই ফজলুল হকের নেতৃত্বে একটি মিছিল নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে শামীমকে আবার মারধর করা হয়। পরে তাঁকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুর রহমানের ছেলে।

হত্যা মামলা ও গ্রেপ্তার

শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ জনকে। পরদিন এজাহারভুক্ত দুই আসামি মোখতার হোসেন খান ও আসাদুল ইসলাম মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

বাবার কবরের পাশে শামীমের দাফন

রোববার দুপুরে দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামে শামীমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির পেছনে তাঁর বাবা শামসুর রহমানের কবরের পাশে শামীমকে দাফন করা হয়েছে। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর ভাই তাওহিদুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘মারা যাওয়ার পর শামীমের জানাজা-দাফন নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। জানাজা-দাফনে বাধা দেওয়ার কথাও শোনা গিয়েছিল। তারপরও আমরা জানাজা-দাফন করেছি। পরিচিত অনেকেই জানাজায় আসেননি। কিন্তু পরে লোকজন বাড়িতে এসে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।’

শামীমের স্ত্রী নাজমা খাতুন জানান, তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং নিয়মিত ওষুধ সেবন করতেন। তিনি সাতক্ষীরা শহরের একটি হোটেলে কাজ করতেন। তাঁর আয়ে সংসার চলত। স্বামীর মৃত্যুর পর আট মাস বয়সী সন্তানসহ দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তিনি।

নাজমা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হতো। সাতক্ষীরা শহরে একটি হোটেলে কাজ করতেন। স্বামীর আয়ে সংসার চলত। এখন ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে আমি কোথায় যাব, কীভাবে চলব, কিছুই বুঝতে পারছি না। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও আমি চিন্তিত। বাড়িতে থাকতেও এখন ভয় লাগে।’

সন্তানদের নিয়ে জীবন চালিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

Link copied!