বৃহস্পতিবার ০৮, অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার ০৮, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

হৃদয়ে গ্রথিত প্রিয় শিক্ষা গুরুর বাণী 

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:১৬ এএম

ফাইল ফটো

প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়। দিবসটি আমাদের সামনে শিক্ষার অগ্রগতি বাড়াতে শিক্ষকদের ভূমিকা ও তাৎপর্য তুলে ধরে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে ধারণা দেয়। শিক্ষক আমাদের জীবনের পথপ্রদর্শক, যিনি আমাদের পরিবারের বাইরের পৃথিবীকে চিনতে সাহায্য করেন। একজন আদর্শ শিক্ষক শুধু পাঠদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, তিনি আমাদের আত্ম-উন্নয়নমূলক ও জীবনমুখী শিক্ষার মাধ্যমে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলেন। অথচ, একটা সময় পর আমরা বেশিরভাগই আমাদের শিক্ষকদের অবদান ভুলে যাই।

আমার জীবনের দর্পণে তাকালে দেখতে পাই খানপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রিয় শিক্ষক সালমা ম্যামকে। জীবনের ভিত্তি তৈরিতে সহায়তাকারী সেখানকার সব শিক্ষকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু, সালমা ম্যামকে বিশেষায়িত করার কারণ, তিনি আমার লেখক জীবনের মূল ভিত্তি তৈরির প্রেরণা। জীবনের প্রথম কবিতাটি লিখেছিলাম ম্যামের নির্দেশে, আর এখন খবরের কাগজে লেখার সৌভাগ্য হচ্ছে তাঁর মমতাময়ী প্রেরণায়।

তিনি আমাকে একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠার বাণী শুনিয়েছিলেন। অনেক দিন যাবত ম্যামের সঙ্গে দেখা হয় না। কিন্তু তাঁর কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে। তাঁর অমোঘ বাণী স্মরণ করে আজও অনুপ্রাণিত হই। "আপনাকে স্যালুট জানাই ম্যাম, অনেক ভালো থাকবেন।"

মো. জাহিদ হাসান
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ 

স্মৃতির ক্যানভাসে প্রিয় শিক্ষক

আমার জীবনের খেরোখাতায় কেবলই প্রিয় শিক্ষকদের নাম লেখা রয়েছে, সেখানে অপ্রিয় কোনো গুরুর স্থান নেই। কারণ, পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক তো কখনো অপ্রিয় হওয়ার বস্তু নন, তাঁরা কেবলই হৃদয়ে ভক্তি আর ভালোবাসায় আগলে রাখার মতো মানুষ। আমার প্রিয় শিক্ষকদের নামের সেই দীর্ঘ তালিকায় অনেকের নামই অম্লান হয়ে আছে, তবে যাঁর নাম উচ্চারণ না করলে আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ অপূর্ণ থেকে যায়, তিনি হলেন শ্রদ্ধেয় সীতেশ চন্দ্র সিংহ রায়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তিনি ছিলেন জয়পুরহাট জেলার সরকারি সাঈদ আলতাফুন্নেছা কলেজের রসায়ন বিভাগের একজন স্বনামধন্য অধ্যাপক। যাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটেছিল দশম শ্রেণীর রসায়নের জটিল সূত্রগুলো সহজ পাঠে শেখার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে, শিক্ষাজীবনের গণ্ডি পেরিয়ে যখন একাদশ শ্রেণীতে পদার্পণ করি, তখনও তাঁরই সান্নিধ্যে থেকে রসায়নের রস আস্বাদন করার পরম সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ওনার প্রাঞ্জল পড়ানোর পদ্ধতি, ক্লান্তিহীন শেখানোর ইচ্ছা আর শিক্ষার্থীদের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। তিনি অতি সামান্য পরিমানে সম্মানির বিনিময়ে আমাদের পড়াতেন। শিক্ষাকে তিনি কখনো বাণিজ্যের দাঁড়িপাল্লায় মাপেননি, তাই উনার কাছে পড়ার সময় কখনোই মনে হয়নি যে তিনি টাকার বিনিময়ে শিক্ষা দিচ্ছেন। এমন দৃশ্যও আমি প্রত্যক্ষ করেছি যে, সারাবছর পড়ার পর কিছু শিক্ষার্থী আর্থিক অভাবের কারণে স্যারকে নামমাত্র কিছু সম্মানি দিচ্ছে, অথচ স্যারের শেখানোর আগ্রহে বা আন্তরিকতায় বিন্দুমাত্র কমতি ঘটেনি। এই নিঃস্বার্থ রূপটি আমাকে বারবার অভিভূত করেছে।

স্যারের পাঠদানের দক্ষতা ছিল অতুলনীয়; ক্লাসে তিনি এমনভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে বাসায় গিয়ে কখনো আলাদা করে পড়া মুখস্থ করতে হতো না বা পরবর্তীতে বুঝতে কোনো অসুবিধা হতো না। সর্বোপরি, স্যার এতটাই অমায়িক ও বন্ধুসুলভ ছিলেন যে যেকোনো বিষয়ে প্রশ্ন করতে আমাদের মনে কখনো কোনো দ্বিধাবোধ বা ভয়ের দেয়াল কাজ করেনি। একজন মহান শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই পড়ান না, বরং শিক্ষার্থীর মনে জানার আগ্রহ এবং বড় হওয়ার স্বপ্ন বুনে দেন। সীতেশ স্যার হলেন সেই আলোর দিশারী যিনি আমার হৃদয়ে আজীবন পূজনীয় হয়ে থাকবেন।

মোঃ আব্দুল্লাহ আল নোমান 
শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।

 জীবন গঠনের কারিগররা 

জীবনের এই পর্যায়ে এসে যখন একটু থেমে পেছনে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি, আজকের আমি আসলে কোনো একজন মানুষের পরিচর্যার ফল নই। আমার আমি হয়ে ওঠার গল্পে অনেক মানুষের ছায়া আছে। কারও স্নেহ, কারও শাসন, কারও একটি ছোট্ট কথা, কিংবা কখনো শুধু নীরবে পাশে থাকার মধ্য দিয়েই আমি একটু একটু করে বড় হয়েছি। কেউ আমাকে কবিতা ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, শব্দের ভেতর লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য খুঁজে নিতে শিখিয়েছেন, কেউ শিখিয়েছেন মানুষের অনুভূতি বুঝতে, কারো নীরবতার আড়ালেও না বলা কথাগুলো শুনতে।

আবার কেউ শিখিয়েছেন, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, নিজের সত্য আর মূল্যবোধ থেকে যেন কখনো সরে না যাই। আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক অবশ্যই আমার মা-বাবা। তাঁদের কাছ থেকেই শিখেছি মানুষ হওয়ার প্রথম পাঠ। বড় ভাইসহ জীবনের বিভিন্ন সময়ে যাঁরা আমাকে পথ দেখিয়েছেন, তাঁরাও প্রত্যেকেই আমার শিক্ষক। কেউ শ্রেণিকক্ষে পড়িয়েছেন, কেউ জীবনের কঠিন সময়ে। কেউ হয়তো কয়েকটি কথা বলেছেন, কিন্তু সেই কথাগুলোই কোনো একসময় আমার জন্য বড় শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার কারো জীবনযাপনই ছিল আমার জন্য সবচেয়ে নীরব, অথচ গভীর পাঠ। তাই, একজন মানুষকে আলাদা করে ‘প্রিয় শিক্ষক’ বললে হয়তো আমার স্মৃতির অনেক প্রিয় মুখের প্রতি অন্যায় করা হবে।

কারণ আজকের আমার ভেতরে তাঁদের প্রত্যেকেরই একটু একটু করে অস্তিত্ব আছে। হয়তো সবাইকে আলাদা করে ধন্যবাদ জানানোর সুযোগ কোনোদিন হবে না। তাই আমার কাছে কৃতজ্ঞতা শুধু একটি শব্দ নয়, বরং একটি দায়িত্ব। আমি যখন ভালো কিছু করার চেষ্টা করি, সত্যের পক্ষে দাঁড়াই, কিংবা অন্য একজন মানুষের প্রতি একটু মানবিক হই, তখন মনে হয়, তাঁদের দেওয়া শিক্ষাগুলোই আমার ভেতর দিয়ে বেঁচে আছে। শেষ পর্যন্ত হয়তো এটাই আমার কাছে আমি হয়ে ওঠার সবচেয়ে সুন্দর গল্প।

শেখ তাসনিম ফাতিমা
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ

স্মৃতিতে অমলিন প্রিয় শিক্ষক
 
"সাধারণ মানের শিক্ষক বলেন, ভালো শিক্ষক বুঝিয়ে দেন, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক প্রদর্শন করেন আর মহান শিক্ষক অনুপ্রাণিত করেন।” – উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ড। একজন শিক্ষককে আমরা সাধারণত শ্রেণিকক্ষের মানুষ হিসেবেই জানি যার হাতে বই, সামনে শিক্ষার্থীদের সারি, কিন্তু এর সঠিক উপলব্ধি শিক্ষা জীবন শেষে জীবন চলার পথে বোঝা যায়। আমার প্রিয় শিক্ষক এমনই একজন যাঁর ক্লাসের সব কথা হয়তো আজ মনে নেই, কিন্তু তাঁর পড়ানোর ধরন, ভুল করলে বুঝিয়ে দেওয়া ও আমার মতো পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের দিকে একটু বেশি নজর দেওয়া এসব কথা এখনো আমার স্মৃতিপটে। তিনি সবার সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করতেন, অযথা কঠোর হতেন না, আর শৃঙ্খলার ব্যাপারে ছিলেন  আপসহীন । পড়ালেখার পাশাপাশি চরিত্র ও আচরণের প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতেন। ধর্মীয় অনুশাসন পালনেও ছিল একনিষ্ঠ।

সময়ের সঙ্গে ক্লাস, সহপাঠী এবং নিত্যদিনের ব্যস্ততায় প্রিয় শিক্ষকের সাথে কাটানো সেই দিনগুলো অনেক ফিকে হয়েছে। কিন্তু তাঁর কিছু সহজ সাবলীল কথা এখনো জীবনের প্রতি মুহূর্তে মনে পড়ে। সর্বোপরি বলতে পারি, একজন শিক্ষকের আসল সাফল্য হয়তো তাঁর পড়ানো কতটা মনে আছে তাতে নয়, বরং শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছ থেকে কতটা ভালো মানুষ হতে শিখেছে, তাতেই নিহিত থাকে। অন্তত এই একটা জায়গাতে আমার প্রিয় শিক্ষক আমার কাছে আজও বিশেষ এবং সারাজীবনই থাকবে।

এম. তাওকীর আহমদ 
শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ

জীবনের দর্পণে প্রিয় শিক্ষক  

শিক্ষাজীবনের অঙ্গনে অনেক শিক্ষকের সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। প্রত্যেকেই আমার শিক্ষাজীবনের সাথে কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছেন; সকলেই প্রিয় আমার কাছে, তবু তাঁদের ভীড়ে শহীদ মনোয়ার কালু স্যার আমার কাছে একটু বেশি আপন, একটু বেশি প্রিয়।

তিনি চামাগ্রাম হে.না. উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। স্যার আমাদের শারীরিক শিক্ষা ক্লাস নিতেন। তিনি ক্লাসে এলেই পরিবেশটা যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠতো। ক্লাসে আসা মাত্রই আমার নাম ধরে মজা করে গেয়ে উঠতেন, “আলো আমার আলো ওগো, আলো ভূবন ভরা।” আজও সেই মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়লে মনটা অদ্ভুত এক ভালো লাগায় ভরে যায়।

তবে, স্যারের ভালোবাসার সঙ্গে ছিল শাসনও। অন্যায় বা ভুল কিছু দেখলে তিনি কখনো ছাড় দিতেন না; প্রয়োজন হলে কঠোরভাবে শাসন করতেন। একবার খুব ছোট একটি কারণে তিনি আমার ওপর রাগ করেছিলেন। অভিমান এতটাই ছিল যে অনেক দিন আমার সঙ্গে কথা বলেননি। তখন তাঁর নীরবতাও আমার কাছে শাসনের চেয়ে বেশি কষ্টের ছিল। কারণ বুঝেছিলাম, তাঁর রাগের আড়ালেও ছিল আমার জন্য ভালো চাওয়ার গভীরতা।

আমার যেকোনো প্রয়োজনে তিনি পাশে থেকেছেন, সাহস দিয়েছেন, আগলে রেখেছেন। তাই আজ মনে হয়, আদর্শ শিক্ষক শুধু ভালোবাসতে জানেন না, প্রয়োজনে শাসন করতেও জানেন। সময় পেরিয়ে গেলেও স্যারের সেই স্নেহমাখা ডাক (অন্ধকার), শাসন আর অভিমান আমার স্মৃতিতে অমলিন। শহীদ মনোয়ার কালু স্যার আমার কাছে শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি আমার শিক্ষাজীবনের এক টুকরো আলো, এক গভীর মায়া।

ফাইজা আক্তার আলো 
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ

আলোর পথপ্রদর্শক

বিদ্যালয় জীবনের দিনগুলো প্রতিটি মানুষের জীবনেই বিশেষ। তবে আমার মাধ্যমিক জীবনের অধ্যায়ে দাশেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মিজানুর রহমান মিজান স্যারের অবদান চিরস্মরণীয়। তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের পাতায় আমাদের শিক্ষা সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং জীবনের সঠিক পথ বেছে নিতে শিখিয়েছেন। যখনই পড়ালেখা কিংবা জীবনের কোনো মোড়ে থমকে দাঁড়িয়েছি, মিজান স্যার পরম মমতায় সঠিক পথ দেখিয়েছেন।

আমার জীবনের সঠিক 'ইউ-টার্ন' নিতে শেখানো মানুষটিই হলেন তিনি। যখন নিজের লক্ষ্য ও ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধায় ভুগছিলাম, তখন স্যারের দেওয়া দিকনির্দেশনা ও অকৃত্রিম উৎসাহ আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিলেন ইচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। স্যারের সেই অনুপ্রেরণাদায়ী কথাগুলোই আজ আমার চলার পথের সবচেয়ে বড় শক্তি। ক্লাসরুমের গণ্ডি পেরিয়ে মিজান স্যার আমাদের শিখিয়েছেন নীতি, আদর্শ ও ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র।

আজ জীবনের প্রতিটি অর্জনে এবং কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলে স্যারের সেই স্মিত হাসিমাখা দিকনির্দেশনার কথা মনে পড়ে। তিনি কেবল একজন আদর্শ শিক্ষক নন, আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া চিরন্তন দিশারী।

আসফিয়া কানিজ ফাতেমা 
শিক্ষার্থী, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ

Link copied!