প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:১৭ পিএম
বিশ্ববিদ্যালয় মানেই শুধু ডিগ্রি অর্জনের স্থান নয়, এটি মনকে বিশ্বের মতো বিশাল করে চিন্তা করতে শেখার এক উন্মুক্ত ক্যানভাস। উত্তরবঙ্গের রাজশাহী, বগুড়া, পঞ্চগড়, রংপুরের শস্যশ্যামল প্রান্তর থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের পলল ভূমি; আবার দক্ষিণবঙ্গের বরিশাল, খুলনা কিংবা দূর পাহাড়ের রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের মেঘের দেশ। দেশের প্রতিটি কোণ থেকে আসা স্বপ্নবাজ তরুণদের এক মহামিলনমেলায় পরিণত হয়েছে "উপকূলীয় অঞ্চলের কেমব্রিজ" হিসেবে পরিচিত নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি)।
নোয়াখালী শহর থেকে কিছুটা দূরে সোনাপুর-সুবর্ণচর সড়কের কোল ঘেঁষে ১০১ একরের সবুজ সাম্রাজ্যে গড়ে উঠেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্পাসে ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়ে গোলচত্বর, মুক্তযুদ্ধ ভাস্কর্য এবং নানা প্রজাতির ফুল ও গাছে ঘেরা দৃষ্টিপ্রতিম শহীদ মিনারের সৌন্দর্য। পাশেই প্রশান্তি পার্কের কোলাহল আর সামনে এগোতেই দেখা মেলে শিক্ষার্থীদের প্রাণের কেন্দ্র 'শান্তিনিকেতন', যেখানে দিনভর মুখরিত থাকে সব বয়সের আড্ডা। একদিকে যেমন রয়েছে সেন্ট্রাল লাইব্রেরি ও মসজিদের সামনে নিবিড়, শান্ত-সুন্দর পরিবেশ, অন্যদিকে রয়েছে থৈ থৈ জলরাশির 'নীল দীঘি'। আর শীতের সময়ে অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হওয়া 'ময়না দ্বীপ' ক্যাম্পাসের রূপকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। এমন এক নৈসর্গিক পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু করা যেন যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্যই এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন।
উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি পরীক্ষার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শত শত মাইল দূর থেকে আসা এই নবীনদের মনে শুরুর দিকে ছিল নানা দ্বিধা ও কৌতূহল। নতুন শহর, অচেনা মানুষ আর অজানা পরিবেশ নিয়ে কিছুটা ভয় কাজ করলেও ক্যাম্পাসে পা রাখার পর সেই আশঙ্কা কেটে গেছে নিমেষেই। ক্লাসরুম, শান্তিনিকেতনের বিকেলের বাতাস আর নতুন বন্ধুত্বের আবহে তারা মানিয়ে নিতে শুরু করেছে এই ক্যাম্পাসের জীবনের সাথে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এই নতুন অধ্যায়, ভালোলাগা, অনুভূতি ও ভবিষ্যৎ পথচলার গল্পগুলো নিয়ে কথা বলেছেন নোবিপ্রবির বিভিন্ন বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীরা।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২১ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মিসরাত জাহান মিলি বলেন “২০শে জুলাই ২০২৬—আমার জীবনের অন্যতম একটি বিশেষ দিন। কারণ, এই দিনেই শুরু হয়েছিল আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম অধ্যায়। নতুন পরিবেশ, নতুন নতুন মুখ আর অসংখ্য স্বপ্ন, সব মিলিয়ে দিনটি ছিল কৌতূহল, উত্তেজনা এবং খানিকটা নার্ভাসনেসে ভরপুর। মনে হচ্ছিল, এখান থেকেই শুরু হবে আমার স্বপ্ন পূরণ ও ক্যারিয়ার গড়ার নতুন যাত্রা। আশা করি, এই পথচলার প্রতিটি পদক্ষেপ আমাকে আরও সমৃদ্ধ করবে এবং একদিন আমার লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে ইনশাআল্লাহ।”
বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের ২১ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী দ্বীপ কর্মকার বলেন “১৯শে জুলাই, ২০২৬।দিনটি আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। শ্রাবণের সেই সোনালী সকালের মৃদু বৃষ্টির ফোঁটার সাথেই শুরু হয়েছিল আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিনটি। মনটার ভেতরে তখন আনন্দ, মন-খারাপ আর মৃদু স্নায়ুচাপের এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি কাজ করছিল।
আনন্দ এই কারণে দীর্ঘ দুই বছরের কঠোর পরিশ্রমের পর অবশেষে আমি নিজের একটা নতুন পরিচয় পেতে যাচ্ছি। অন্যদিকে বুক চিরে মন-খারাপের মেঘ জমেছিল অন্য এক কারণে; আজ এই বিশেষ দিনে আমার মা-বাবা কেউই আমার পাশে ছিলেন না। ছোটবেলা থেকেই স্কুলের প্রতিটি নতুন ক্লাসের প্রথম দিনে মা আমার হাতটি শক্ত করে ধরে সাথে যেতেন, কিন্তু আজকের এই বিশেষ বাঁকে মা পাশে ছিলেন না। আর nervousness কাজ করছিল কারণ যেসব বন্ধুদের সাথে আজকের দিনে একসাথে ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা ছিল, তাদের কেউই শেষ পর্যন্ত উপস্থিত থাকতে পারেনি।
একাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে চেপে বসলাম। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মায়ের সাথেই ফোনে কথা বলছিলাম। বাসের ঝাঁকুনিতে স্মৃতিরা যেমন ভাসছিল, তেমনই মনে হচ্ছিল এবার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বড় হওয়ার সময় এসে গেছে।
ক্যাম্পাসে পৌঁছেই ডিপার্টমেন্টের এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। সে আসার পর আমরা দুজনে একসাথে আমাদের কাঙ্ক্ষিত ডিপার্টমেন্টের ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। রুমে গিয়ে একে একে বাকিদের সাথে পরিচিত হলাম। যদিও মেসেঞ্জার গ্রুপের সৌজন্যে আমাদের ভার্চুয়ালি আগেই চেনা-জানা হয়ে গিয়েছিল, তবুও সামনাসামনি দেখা হওয়ার অনুভূতিটাই ছিল অন্যরকম। সবাই খুব আন্তরিক ও সহযোগিতাপূর্ণ ছিল, যা দেখে মনের ভেতরে থাকা সবটুকু দ্বিধা আর একাকীত্বের কষ্ট নিমেষেই উধাও হয়ে গেল।
ক্লাসরুমে প্রায় এক ঘণ্টা গল্প আর অপেক্ষার পর শুরু হলো আমাদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম । সম্মানিত শিক্ষকেরা একে একে নিজেদের পরিচয় দিলেন এবং আমাদেরও পরিচয় পর্ব সম্পন্ন হলো। ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে আমাদের সবাইকে বেলী ফুল দিয়ে উষ্ণ শুভেচ্ছা জানানো হলো সেই ফুলের সুবাসে যেন পুরো ঘরটা এক নতুন আমেজে ভরে উঠলো। এরপর শিক্ষকেরা আমাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মূল্যবান উপদেশ দিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য কেমন হওয়া উচিত এবং আমাদের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের বিগত বছরের অর্জনগুলো কী কী, সে বিষয়ে একটি সুন্দর ধারণা দিলেন। শিক্ষকদের অমায়িক ও বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারে আমরা সবাই দারুণ অনুপ্রাণিত বোধ করছিলাম।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে যখন আমাদের হাতে অফিশিয়াল ক্লাস রুটিনটা তুলে দেওয়া হলো, তখন মনের ভেতরের আগ্রহ যেন আর ধরে রাখা যাচ্ছিল না! কখন যে ক্লাস শুরু হবে, সেই অপেক্ষার তর যেন আর সইছিল না। ওরিয়েন্টেশন শেষে সব বন্ধুদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিলাম, একসাথে কিছুটা সোনালী সময় পার করে দিনশেষে নতুন এক অভিজ্ঞতা আর স্বপ্ন বুক নিয়ে বাসায় ফিরে এলাম।”
ICE বিভাগের ২১ তম ব্যাচের আরেক নবীন শিক্ষার্থী বলেন “স্কুল-কলেজের প্রথম দিনের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনের উত্তেজনাটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। তারুণ্যে পা রাখা, সামনের নতুন দায়িত্ব, সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন,সবকিছুর পাশাপাশি মা-বাবার স্নেহের ছায়া ছেড়ে স্বাধীন জীবনের স্বাদ নেওয়ার অনুভূতি; সব মিলিয়ে একই সঙ্গে উৎকন্ঠিত ও উত্তেজিত ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করেই প্রথমবার ক্যাম্পাসে পৌঁছাই। মনে তখন একদিকে ছিল নতুন জায়গায় যাওয়ার সংকোচ ও অজানা ভয়, অন্যদিকে নতুন সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগ্রহ। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এত নতুন মানুষের সঙ্গে এবার একসঙ্গে পথচলা শুরু হবে-ভাবনাটাও ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টুকটাক কথা হলেও, সামনাসামনি পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতাটা তখনও হয়নি। তাই সেটিও ছিল আলাদা এক উত্তেজনা।প্রথমে আমাদের বিভাগের শিক্ষকেরা এসে আমাদের স্বাগত জানান।
তাঁরা আইসিই বিভাগ সম্পর্কে আমাদের অনুপ্রাণিত করেন এবং জানান, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে তথ্য প্রযুক্তি -সম্পর্কিত একটি বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেয়ে আমরা কতটা সৌভাগ্যবান। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নিয়ম-কানুন সম্পর্কেও আমাদের ধারণা দেন। এরপর আসে দিনের সবচেয়ে আনন্দের অংশ, আমাদের বিভাগের নিকটবর্তী অগ্রজ ব্যাচ এর সঙ্গে পরিচয়। অচেনা শহরে এসে তাঁরাই যেন ধীরে ধীরে আমাদের অভিভাবকের মতো হয়ে উঠলেন। তাঁদের আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ আমাদের খুব সহজেই আপন করে নেয়।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সহপাঠীদের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিতে হয়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পারষ্পরিক যোগাযোগের গুরুত্ব কতটা, পাশাপাশি পরিণত হওয়া, দায়িত্বশীলতা ও নিজের কর্তব্য সম্পর্কে তাঁদের কাছ থেকেই অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারি। তাঁদের কথায় ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনুপ্রাণিত হয়েছি এবং নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আরও সচেতন হয়েছি। সবশেষে তাঁদের দেওয়া অসাধারণ খাবারের আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রথম দিনের এই সুন্দর আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে। নতুন শহর, নতুন বিভাগ, নতুন বন্ধু আর অগ্রজদের এই আন্তরিকতা। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতাটি আমার কাছে এমন একটি স্মৃতি যা সারাজীবনই মনে থাকবে।
সানজিদা আফরিন সিনথি।”
আরেক নবীন শিক্ষার্থী নাবিয়াতুল জাহান বনেন “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল আমার প্রথম স্বপ্ন, কিন্তু ভাগ্য হয়তো আমার জন্য ভিন্ন পথ ঠিক করে রেখেছিল। সবশেষে আমার জীবনতরী এসে ভিড়ল নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। শুরুতে খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও সমাজবিজ্ঞান বিষয় নিয়ে যখন নিজে টুকটাক পড়াশোনা ও গবেষণা শুরু করলাম, তখন ধীরে ধীরে বিষয়টির প্রতি এক গভীর অনুরাগের জন্ম হলো।
অবশেষে এল সেই বহু কাঙ্ক্ষিত প্রথম দিন। সকালে বাসার সামনে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল দোতলা বাসে চেপে যখন ক্যাম্পাসের উদ্দেশে রওনা হলাম, মনটা এক অদ্ভুত রোমাঞ্চে ভরে উঠল। ক্যাম্পাসে পৌঁছে বিভাগের সামনে বন্ধুদের সাথে দেখা হতেই জমে উঠল গল্প। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটল এক মজার ঘটনা আমাদের বিভাগেরই এক নবীন শিক্ষার্থী আমাকে সিনিয়র মনে করে সশ্রদ্ধ সালাম জানাল এবং IQAC সেমিনার রুমের পথ জানতে চাইল! আমিও বেশ সুন্দর করে তাকে পথ বুঝিয়ে দিলাম।
নবীনবরণ অনুষ্ঠানের শুরুতে আমাদের ফুল ও শুভেচ্ছা কার্ড দিয়ে বরণ করে নেওয়া হলো। শিক্ষক ও জ্যেষ্ঠদের অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য এবং মনোগ্রাহী গানের সুরে পুরো প্রাঙ্গণ যেন রঙিন হয়ে উঠেছিল। তবে দিনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল প্রথম দিনেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে অনুভূতি ব্যক্ত করার সুযোগ পাওয়া। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে শুরুতে একটু ইতস্তত বোধ করলেও সবার করতালিতে ভেতরে এক অন্যরকম সাহস সঞ্চার হলো। দিনশেষে সবাই মিলে আলোকচিত্র ধারণ করা আর ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার চমৎকার স্মৃতি নিয়ে আবারও সেই লাল বাসে চেপেই বাড়ি ফিরলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আক্ষেপ ভুলে গিয়ে প্রথম দিনেই এই ক্যাম্পাস, বিভাগ আর মানুষগুলো যেন আমার বড্ড আপন হয়ে গেল।”
