শুক্রবার ২৪, জুলাই ২০২৬

শুক্রবার ২৪, জুলাই ২০২৬ -- : -- --

মৌলভীবাজারে অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব, হুমকিতে পাহাড়ি ছড়া

মৌলভীবাজার থেকে রাজন হোসেন তৌফিক

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম

ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া থেকে অবৈধভাবে সিলিকা বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি চক্র প্রশাসনের নজর এড়িয়ে বা সুযোগ নিয়ে বালু উত্তোলন চালিয়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জেলায় খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর অনুমোদিত ৩৩টি সিলিকা বালুর কোয়ারি রয়েছে। ২০১৩ সালের ১৮ জুন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর উদ্যোগে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে জেলার ৫১টি পাহাড়ি ছড়াকে সিলিকা বালুসমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ১৯টি ছড়ায় অযান্ত্রিক পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছিল।

তবে ইজারার আড়ালে অনিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবিধি লঙ্ঘন করে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় ২০১৬ সালে বেলা জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। শুনানি শেষে একই বছরের ২১ মার্চ পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (EIA) এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র (ECC) ছাড়া নতুন করে ইজারা প্রদান ও বালু উত্তোলনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন হাইকোর্ট।

অভিযোগ রয়েছে, আদালতের ওই নির্দেশনা উপেক্ষা করে কমলগঞ্জের দেওছড়া, সুনছড়া, জপলাছড়া, লাউয়াছড়াসহ বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া থেকে এখনও দিন-রাত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু ব্যবসার সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল জড়িত থাকায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শ্রমিকদের দিয়ে বালু উত্তোলনের পর ট্রাক, পিকআপ, ট্রলি ও ঠেলাগাড়িতে করে তা বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের উপস্থিতির খবর পেলেই সংশ্লিষ্টরা এলাকা ত্যাগ করলেও অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও একই কার্যক্রম শুরু হয়।

এ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় দেওছড়া এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়েছে। সর্বশেষ অভিযোগের ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে ঘটনাস্থলে পাঠানো হলেও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য ছড়া থেকেও অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আক্তার বলেন, ইজারা ছাড়া বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ অবৈধ। এটি বন্ধ করা প্রশাসনের দায়িত্ব। যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহায়তা করছেন, তারা উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করছেন।

পরিবেশবিদদের মতে, অব্যাহতভাবে পাহাড়ি ছড়া থেকে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে পাহাড় ধস, জলাধার সংকট ও কৃষিজমির ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিও বাড়বে।

স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত সময়ের মধ্যে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর অভিযান, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পাহাড়ি ছড়াগুলো সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে মৌলভীবাজারের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।

Link copied!