রাশেদুজ্জামান রাশেদ,জবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:৫২ এএম
রবিবার ১২, জুলাই ২০২৬ -- : -- --
সংগৃহীত ছবি
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের নতুন ডিন হিসেবে ড. আইনুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের একাংশ এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা এ নিয়োগের বিরোধিতা করে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, অতীতের বিভিন্ন বিতর্ক ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা একজন শিক্ষককে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ড. আইনুল ইসলাম আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তাদের দাবি, ওই বৈঠকে আন্দোলন দমনসংক্রান্ত আলোচনা হয়েছিল। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং ড. আইনুল ইসলামের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় একটি নৈতিক স্খলনের অভিযোগের ঘটনায় তিনি আলোচনায় আসেন এবং পরবর্তীতে প্রক্টরের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়।
আরও অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথিপত্র সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, যেখানে ড. আইনুল ইসলামের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলেন শিক্ষার্থীদের একাংশ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ড. আইনুল ইসলামের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী অবস্থানের অভিযোগ তুলেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, বিভিন্ন সময় ফ্যাসিবাদী শক্তির সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হচ্ছে।
ড. আইনুল ইসলামের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা।
জবি ছাত্রদলের আহবায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, "জুলাইয়ের গণহত্যাকারীদের কোনো দোসরকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে পুনর্বাসন করার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না। ৩ আগস্ট যখন আমাদের ভাইদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন যারা গণভবনে গিয়ে খুনি হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার বুদ্ধি দিচ্ছিল, তারা সরাসরি অপরাধী। প্রশাসন কোন স্বার্থে বা কার ইশারায় একজন যৌন কেলেঙ্কারি ও ফাইল গায়েবের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ডিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারে বসালো, তা স্পষ্ট করতে হবে। ছাত্রদল ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে অতীতেও আপসহীন ছিল, এখনও আছে। আমরা অবিলম্বে এই বিতর্কিত নিয়োগ বাতিলের দাবি জানাচ্ছি, অন্যথায় শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।"
জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, "জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র হতে পারে না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রশাসন চেয়ারে বসে এখন খুনিদের দোসরদের শেল্টার দিচ্ছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। ড. আইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে নথিপত্র চুরির চেষ্টা ও অতীতের নৈতিক স্খলনের স্পষ্ট প্রমাণ থাকার পরেও তাকে পুরস্কৃত করা জুলাই বিপ্লবের শহীদদের সাথে বেইমানি। বর্তমান ভিসি মুখে বড় বড় কথা বললেও কাজে তার উল্টোটা দেখা যাচ্ছে। আমরা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে স্পষ্ট বলতে চাই,স্বৈরাচারের এই দোসরকে ডিন পদ থেকে অপসারণ করতে হবে। প্রশাসন যদি টেন্ডারবাজি বা নিজেদের বলয় ভারী করার নোংরা রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকে, তবে ছাত্রসমাজ রাজপথেই এর উপযুক্ত জবাব দেবে।"
এছাড়া জবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, "যারা ৩ আগস্ট গণভবনে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানোর কুরামর্শ দিয়েছিল, তারা শিক্ষক নামের কলঙ্ক। ৫ আগস্টের পর যারা ফাইল গায়েবের অপচেষ্টা চালিয়েছিল, তাদের স্থান ডিনের চেয়ারে নয়, হওয়া উচিত ছিল কারাগারে। বর্তমান প্রশাসন একদিকে ফ্যাসিবাদের বিচারের কথা বলে, অন্যদিকে গোপনে আইনুল ইসলামদের মতো কুখ্যাত স্বৈরাচারের দোসরদের পুনর্বাসিত করে দ্বিমুখী নীতি দেখাচ্ছে। আমরা জবি ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে পরিষ্কার ঘোষণা করছি—ক্যাম্পাসে কোনো স্বৈরাচারের দালালদের রাজত্ব আর চলতে দেওয়া হবে না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে অবমূল্যায়ন করে এই পদায়ন বহাল রাখলে ক্যাম্পাসকে আবার রাজপথে উত্তাল করা হবে।"
ছাত্রসংগঠনগুলোর ধারাবাহিক প্রতিবাদের ঘোষণার মধ্যে ড. আইনুল ইসলামের নিয়োগ ঘিরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা ড. আইনুল ইসলামের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে সংযোজন করা হবে।