ছাইম ইবনে আব্বাস,এমসি কলেজ, সিলেট।
প্রকাশিত: ২৭ জুন ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
শনিবার ২৭, জুন ২০২৬ -- : -- --
ফাইল ফটো
সবুজ টিলার বুকে লাল-সাদা পদ্মে মোড়া পুকুর, ভোরের পাখির কলতান আর শতবর্ষী ভবনের নীরব সাক্ষ্য প্রতিদিন যেন ইতিহাসের একটি নতুন পৃষ্ঠা খুলে দেয় সিলেটের মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ। সময়ের স্রোত পেরিয়ে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই বিদ্যাপীঠ শনিবার (২৭ জুন) ১৩৪ বছর পূর্ণ করে পদার্পণ করল ১৩৫ বছরে।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কেবল পাঠদান নয়, রাষ্ট্র, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, রাজনীতি, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অগণিত কৃতী মানুষের জন্ম দিয়েছে এমসি কলেজ। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সাফল্যের এই দীর্ঘ অভিযাত্রা আজও শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের ঠিকানা হয়ে আছে।
সম্প্রতি সরকারি কলেজগুলোর শ্রেণিবিন্যাসে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাতারে উঠে এসেছে এমসি কলেজ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দেশের ৭০৮টি সরকারি কলেজের মধ্যে 'এ' ক্যাটাগরিতে স্থান পাওয়া ৮১টি কলেজের তালিকায় অষ্টম অবস্থানে রয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। নতুন এই স্বীকৃতি যেন ১৩৫ বছরে পা রাখা কলেজটির গৌরবময় ইতিহাসে যুক্ত করেছে আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায়।
তবে অর্জনের এই দীপ্তির আড়ালেও রয়ে গেছে কিছু দীর্ঘদিনের বেদনা। শতবর্ষী আসাম প্যাটার্নের ঐতিহাসিক ভবনগুলো আজ সংরক্ষণের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে। অন্যদিকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে কলেজের একমাত্র ক্যান্টিন। ফলে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের শিক্ষা-জীবনে যোগ হচ্ছে নানা ভোগান্তি।
আজকের এমসি কলেজের সূচনা কিন্তু কলেজ হিসেবে নয়। ১৮৮৬ সালে 'মুরারিচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয়' নামে যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির। তৎকালীন রাজা গিরিশ চন্দ্র রায় তাঁর মাতামহ জমিদার মুরারিচাঁদ রায়ের স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই প্রতিষ্ঠা করেন বিদ্যালয়টি।
সেই সময় সিলেট শহরের গোবিন্দচরণ পার্ক (বর্তমান হাসান মার্কেট) এলাকায় বাঁশ ও নলখাগড়ার তৈরি একটি সাধারণ ঘরে চলত শিক্ষা কার্যক্রম। পরে ১৮৯২ সালের ২৭ জুন মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ হিসেবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে মুরারিচাঁদ কলেজ।
১৯১২ সালে সরকারি কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর ১৯২১ সালে তৎকালীন আসামের শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদের উদ্যোগে কলেজটি প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হয়। একই সময়ে সবুজে ঘেরা টিলাগড়ের থ্যাকারে টিলায় স্থানান্তরিত হয় ক্যাম্পাস। ১৯২৫ সালে উদ্বোধন করা হয় প্রায় দেড়শ একর আয়তনের বর্তমান ক্যাম্পাস, যা আজও দেশের অন্যতম নান্দনিক শিক্ষাঙ্গন হিসেবে পরিচিত।
১৯২৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফলের মাধ্যমে উপমহাদেশের অন্যতম সেরা কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এমসি কলেজ।
মাত্র ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে অধ্যয়ন করছেন ১১ হাজার ৮৮৬ জন শিক্ষার্থী।
এর মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে রয়েছে ৬০০ জন, স্নাতক পাস কোর্সে ৩ হাজার ৭৪০ জন, অনার্সে ৪ হাজার ৫০৬ জন এবং মাস্টার্সের বিভিন্ন বর্ষে প্রায় ৩ হাজার ৪০ জন শিক্ষার্থী।
তাদের পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন ১০৮ জন শিক্ষক। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৫১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কলেজটির প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
সবুজ টিলা, শতবর্ষী বৃক্ষ, পদ্মে ভরা পুকুর, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, ঐতিহ্যবাহী শহীদ মিনার ও দৃষ্টিনন্দন মসজিদ—সব মিলিয়ে এমসি কলেজ যেন প্রকৃতি ও শিক্ষার এক অনন্য মেলবন্ধন।
প্রায় ৩০ হাজার বইয়ের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার এখনও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে চলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিক্ষার্থীর মাঝে।
কিন্তু এই সৌন্দর্যের মাঝেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে শতবর্ষী আসাম প্যাটার্নের ভবনগুলো। সংস্কারের বদলে নতুন ভবন নির্মাণের প্রবণতা ঐতিহ্যের ওপর তৈরি করেছে অনিশ্চয়তার ছায়া। এসব ভবন সংরক্ষণের দাবিতে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জনমত গড়ে তুলছে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট।
জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষস্থানীয় কলেজের স্বীকৃতি মিললেও শিক্ষার্থীদের অন্যতম বড় সংকট হয়ে আছে ক্যান্টিনের অভাব।
২০১৪ সাল পর্যন্ত কলেজে ক্যান্টিন চালু থাকলেও বকেয়া বিলের জটিলতায় ব্যবসা গুটিয়ে নেন ইজারাদার। পরে ভবনটি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু হলেও আর চালু হয়নি নতুন কোনো ক্যান্টিন।
ফলে প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থীকে ভরসা করতে হয় ক্যাম্পাসের ভ্রাম্যমাণ দোকানের ঝালমুড়ি, ফুচকা কিংবা বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর। এতে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, তেমনি ক্লাসের সময় নষ্ট করে বাইরে গিয়ে খাবার সংগ্রহ করতেও হচ্ছে।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান তানিম বলেন, "এত বড় কলেজে একটি স্বাস্থ্যসম্মত ক্যান্টিন না থাকা সত্যিই দুঃখজনক। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পরিবেশের কথা বিবেচনা করে দ্রুত ক্যান্টিন চালুর দাবি জানাচ্ছি।"
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী সুমন মালাকার শাওন বলেন, "ক্যান্টিন না থাকায় প্রতিদিন বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হয়। বাইরে গিয়ে খাবার খাওয়ার সময় নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখিও হতে হয়।"
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ তোফায়েল আহাম্মদ বলেন, "মুরারিচাঁদ কলেজের ১৩৫ বছরের পথচলা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দেশে-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। এই গৌরব অক্ষুণ্ণ রাখতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি।"
ক্যান্টিন চালুর বিষয়ে তিনি জানান, সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করেই নতুন করে ক্যান্টিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শতবর্ষী আসাম প্যাটার্নের ভবন প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ বলেন, "এই ভবনগুলো আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। মূল নকশা অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে এগুলো সংস্কার ও ব্যবহারোপযোগী করা যায়, সে বিষয়ে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে।"
১৩৫ বছরে পদার্পণ করা এমসি কলেজ আজও ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিক্ষার দীপ্ত প্রতীক। নতুন অর্জনের আলোয় আলোকিত এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এখন শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা—ঐতিহ্য রক্ষা হোক, ফিরুক স্বাস্থ্যসম্মত ক্যান্টিন, আর আগামী দিনের পথচলায় আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক শতবর্ষী এই বিদ্যাপীঠ।