মৌলভীবাজার থেকে রাজন হোসেন তৌফিক
প্রকাশিত: ২১ জুন ২০২৬, ১১:২৪ পিএম
মঙ্গলবার ২৩, জুন ২০২৬ -- : -- --
ছবি।ক্যাম্পাস রিপোর্ট
হাঁসলি, হাইকেল, পাতিচখা, মাচাং পিঠা বিলুপ্তির পথে থাকা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অলংকার, খাদ্য ও কৃষি উপকরণ নিয়ে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে বসেছিল ‘হারমনি ফেস্টিভ্যাল’। গতকাল শুক্রবার বিকেলে ফুলছড়া চা-বাগানের মাঠে এক ছাদের নিচে মিলিত হয় মণিপুরি, সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া, ওঁরাও, বাড়াইক, খাড়িয়াসহ ২৭টি জাতিসত্তার মানুষ।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগে এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম। আয়োজকরা জানান, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করাই উৎসবের মূল লক্ষ্য।
প্যান্ডেলের টেবিলে টেবিলে সাজানো ছিল রুপা ও গিল্টি করা ঐতিহ্যবাহী অলংকার। সাঁওতালদের নাতুনি, হাঁসলি, খোঁপার কাঁটা; গৌড়দের শিরবান্দি, হাইকেল, গড়মোল; কন্দদের হাতের খাকসা, কঙ্কণ—নাম আলাদা হলেও গঠন ও ব্যবহারে মিল রয়েছে অনেক অলংকারের।
সাঁওতাল স্বপন বলেন, নানা কারণে অলংকারগুলোর ব্যবহার প্রায় বিলুপ্তির পথে। গৌড় সম্প্রদায়ের শ্রীকান্ত গৌড় জানান, বিয়েশাদিতে লাগে, এমন অলংকারগুলোই শুধু টিকে আছে। বাকিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।
খাদ্য সংস্কৃতির বদল হলেও উৎসব-পার্বণে এখনো টিকে আছে আদিবাসী খাবার। গারো তরুণীরা এনেছিলেন কলাপাতার পিঠা, ললপটি মানটি, মিমুল মি। খাসিদের টেবিলে ছিল মাচাং পিঠা। চা-শ্রমিক নমিতা ভর ও বীণা ইংগুয়ার ‘পাতিচখা’ তৈরি করে দেখান—কচি চা-পাতা, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, চাল ভাঁজা দিয়ে তৈরি এই খাবার বাগানে দুপুরের আহার।
পিংকি হাজং বলেন, মন চাইলেই আমরা এখনো এসব খাবার করে খাই।
বাড়াইকদের টেবিলে ছিল ঐতিহ্যবাহী কৃষি যন্ত্রপাতি। রিকিয়াশনদের টেবিলে মাটির তৈরি পূজার উপকরণ। সোনালি রিকিয়াশন বলেন, “বিয়ের সময় লাগে বলে এগুলো সংরক্ষণ করি। বাকিটা হারিয়ে যাচ্ছে।
কন্দ সম্প্রদায়ের রবীন কন্দ জানান, মারুয়া, তাকলদার মতো যন্ত্রের নিয়মিত ব্যবহার নেই। শুধু বিয়েতে লাগে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী মো. আবদুর রউফ বলেন, সিলেটে ২৭টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে কালচারাল ভিলেজ গড়ে তোলা হবে।
বৃহত্তর সিলেট মুন্ডা সমাজকল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লক্ষণ মুন্ডা বলেন, ট্র্যাডিশনালি ব্যবহারের নিয়ম থাকায় অলংকারগুলো এখনো আছে। না হলে হারিয়ে যেত।
বিকেলের ভ্যাপসা গরম আর আগের রাতের বৃষ্টিতে মাঠের ঘাসের নিচে পানি জমলেও উৎসাহে ভাটা পড়েনি। প্যান্ডেলের ভেতরে গুমোট গরম থাকলেও বাইরে বইছিল চা-বাগানের ঠান্ডা হাওয়া। সন্ধ্যার পর মঞ্চে চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নৃত্য ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। আগামী রোববার পর্যন্ত চলবে এই উৎসব।