রবিবার ২১, জুন ২০২৬

রবিবার ২১, জুন ২০২৬ -- : -- --

নোবিপ্রবিতে অ্যাওয়ার্ডের খবর পেয়ে উচ্ছ্বাস, পরে তালিকা থেকে বাদ; শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ

নোবিপ্রবি থেকে রাকিব মোহাম্মদ আরজু

প্রকাশিত: ২০ জুন ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম

প্রতীকী ছবি।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) ২০তম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে অনুষদভিত্তিক সর্বোচ্চ ফলাফলধারী শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয়বারের মতো ডিনস অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে আগামী ২২ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার প্রদান করার কথা থাকলেও পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ ও পরবর্তী সংশোধন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে পূর্বঘোষিত তালিকা পরিবর্তন করে কয়েকজন শিক্ষার্থীর নাম বাদ দেওয়া এবং নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করায় প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ জুন ডিনস অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অফিসিয়াল তালিকা প্রকাশ করে নোবিপ্রবি রিসার্চ সেল। ওই তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী এবং উপউপাচার্য ও রিসার্চ সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলামের স্বাক্ষর ছিল। প্রকাশিত তালিকায় ২২ জন শিক্ষার্থীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

তবে পরদিন ১৮ জুন ডিনস অফিস থেকে নতুন একটি সংশোধিত তালিকা সংযোজন করা হয়। এতে আগের তালিকা থেকে তিনজন শিক্ষার্থীর নাম বাদ দেওয়া হয় এবং নতুন করে চারজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এ ছাড়া বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি (বিএমবি) বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যদিও সংশোধিত তালিকাটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়নি, তবু বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

অফিসিয়াল তালিকা অনুযায়ী, ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ থেকে নাহিন সুলতানা লিজা (ইইই), নিলয় দাস (আইসিই) ও হৃদয় বণিক (ইইই) নির্বাচিত হন। বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ থেকে নির্বাচিত হন নাফিসা জান্নাতুল মাওয়া (এমআইএস), সাদিউল আলম চৌধুরী (ব্যবসায় প্রশাসন) ও এমরান হোসাইন (ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট)।

জীববিজ্ঞান অনুষদ থেকে নির্বাচিত হন মো. রকিবুল হাসান (অণুজীববিজ্ঞান), ফজলে রাব্বী শুভ (ফার্মেসি) ও সুকন্যা সাহা (বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি)। আইন অনুষদ থেকে নির্বাচিত হন মো. মুবদি ইসলাম (আইন)।

বিজ্ঞান অনুষদ থেকে নির্বাচিত হন ইশরাত জাহান (পরিসংখ্যান), মনিকা ধর (সমুদ্রবিজ্ঞান) ও নাদিয়া জাহান (সমুদ্রবিজ্ঞান)। কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ থেকে নির্বাচিত হন ইশরাত জাহান ইভা (ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট), সাদিয়া সুলতানা (সমাজকর্ম) ও মোসাম্মৎ কামরুন নাহার (অর্থনীতি)।

এ ছাড়া ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষা বিজ্ঞান অনুষদ থেকে নির্বাচিত হন রাহনুমা নূরাইন (শিক্ষা), হাফসা আক্তার (শিক্ষা প্রশাসন) ও আরাফাত উল্লাহ আরমান (শিক্ষা)। বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ থেকে নির্বাচিত হন মারিয়া তাবাসসুম (এমআইএস), আয়েশা সিদ্দিকা (ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট) এবং ডালিয়া রানী শর্মা (ব্যবসায় প্রশাসন)।

ডিন অফিসগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সংশোধিত তালিকায় মোট তিনজন শিক্ষার্থীর নাম বাদ দেওয়া হয় এবং চারজন নতুন শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে ইইই বিভাগের হৃদয় বণিকের নাম বাদ দিয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসটিই) বিভাগের মনীষা মজুমদারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বিজ্ঞান অনুষদের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের নাদিয়া জাহানের নাম বাদ দিয়ে ফলিত গণিত বিভাগের সাবরিনা সুলতানা রিচিকে যুক্ত করা হয়।

এ ছাড়া শিক্ষা বিজ্ঞান অনুষদের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের আরাফাত উল্লাহ আরমানের নাম বাদ দিয়ে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের দুজন নতুন শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁরা হলেন তাসফিয়া নওয়ার ইরা (শিক্ষা) এবং মুসলিমা আফরোজ শম্পা (শিক্ষা প্রশাসন)।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি, ১৭ জুন প্রথম তালিকা প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে ডিনস অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। প্রশাসনের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এমন তথ্য পাওয়ার পর তাঁরা পরিবার, বন্ধু ও সহপাঠীদের সঙ্গে আনন্দের খবরটি ভাগাভাগি করেন। কিন্তু কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ বা পূর্বাভাস ছাড়াই সংশোধিত তালিকায় নিজেদের নাম বাদ পড়তে দেখে তাঁরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হন। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, প্রশাসনের এমন অপেশাদার ও দায়িত্বহীন আচরণ তাঁদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

তালিকা থেকে বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের একজন, বিজ্ঞান অনুষদের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাদিয়া জাহান বলেন, “এটা নিয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না। এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যা অপমান করার করে ফেলছে। আটটি সেমিস্টার, এসএসসি, এইচএসসি রেজাল্ট দেখার পর আমাকে সিলেক্ট করা হয়েছিল। এরপরও বিভাগ একই হবার অজুহাতে বাদ পড়াটা খুবই দুঃখজনক।”

প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ইইই বিভাগের শিক্ষার্থী হৃদয় বণিক বলেন, “কেন বাদ দেওয়া হয়েছে সেটা তো জানি না। তবে হয়তো কোনো যৌক্তিক নিয়ম ছিল। আর প্রথমে হয়তো কোনো মিসক্যালকুলেশনে আমার নামটা চলে এসেছিল।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেল সূত্রে জানা যায়, ‘ডিনস অ্যাওয়ার্ড সংক্রান্ত নীতিমালা (প্রস্তাবিত)-২০২৫’-এর ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একই অনুষদের অন্তর্গত একাধিক বিভাগের মধ্যে কোনো একটি বিভাগ থেকে একই সময়ে সর্বোচ্চ একজন শিক্ষার্থীকে এই অ্যাওয়ার্ড দেওয়া যাবে। অর্থাৎ, একই অনুষদের একটি বিভাগ থেকে একই শিক্ষাবর্ষে দুজন শিক্ষার্থী মনোনীত হওয়ার সুযোগ নেই।

এ নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রথমে ভুল তালিকা প্রকাশ এবং পরে তা সংশোধনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডিন ও রিসার্চ সেলের কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন।

নোবিপ্রবি রিসার্চ সেলের ডেপুটি রেজিস্ট্রার কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী বলেন, “গত ১৭ তারিখ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ, বিজ্ঞান অনুষদ এবং শিক্ষা বিজ্ঞান অনুষদের ডিনগণ আমাদের কাছে যে তালিকা প্রেরণ করেছেন আমরা সেটাই প্রকাশ করি। এখানে ডিন মহোদয়গণ যে যে শিক্ষার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছেন সেই তালিকা কোনো প্রকার পরিবর্তন করার অধিকার আমাদের নেই। মনোনয়নের সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্ব স্ব ফ্যাকাল্টটির ডিনদের। গতকাল ১৮ জুন উনারা আমাদের কাছে আবার একটি তালিকা সংশোধিত করে প্রেরণ করলে আমরা তা প্রকাশ করি।”

প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আশরাফুল আলম বলেন, “আমি কিছুদিন আগে দায়িত্ব পেয়েছি। আমরা ডিনস কমিটি বসে অ্যাওয়ার্ড মনোনয়ন করার সময় নীতিমালার ওই বিষয়টি খেয়াল ছিল না যে একই বিভাগ থেকে একজনের বেশি দেওয়া যায় না। পরবর্তীতে রিসার্চ সেল অফিস থেকে জানানোর পর আমরা সংশোধন করে নতুন তালিকা প্রেরণ করি।”

বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান বলেন, “আমরা ডিনস অ্যাওয়ার্ড নীতিমালার একই বিভাগের দুইজনকে যে দেওয়া যায় না সেটি ওভারলুক (এড়িয়ে) করে গেছি। পরবর্তীতে রিসার্চ সেল থেকে জানার পর সংশোধন করে আবার তালিকা পাঠিয়েছি।”

বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের বিষয়ে তিনি বলেন, “নিয়মের কারণে যেহেতু বাদ দেওয়া হয়েছে, তাই তাদের আবার অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আমাদের আসলে কিছুই নেই।”

শিক্ষা বিজ্ঞান অনুষদের নবনিযুক্ত ডিন অধ্যাপক ড. আবিদুর রহমান বলেন, “এই তালিকা আসলে আমি পাঠাইনি। আমি দায়িত্ব নিয়েছি এক সপ্তাহ হয়েছে। আগে যিনি ডিন ছিলেন তিনি তালিকাটা পাঠিয়েছিলেন। সেখানে ভুলে একই বিভাগের দুইজনকে দেওয়া হয়েছে। আমাদের মধ্যে যারা দায়িত্বে আছেন তাদেরকে ভবিষ্যতে সঠিক তথ্য জেনে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে।”

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে নোবিপ্রবির উপউপাচার্য ও রিসার্চ সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, “এই ভুলটা বিভিন্ন অনুষদের যারা ডিন আছেন তারা করেছেন। কেননা ডিনস অ্যাওয়ার্ড মনোনয়ন ওই অনুষদের ডিন ও চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব। গতকাল একজন শিক্ষার্থী বলার পর বিষয়টি আমাদের নজরে আসে। যেখানে একই বিভাগ থেকে দুইজনকে দেয়ার নিয়ম নেই। পরবর্তীতে আমরা স্ব স্ব অনুষদের ডিনদের সংশোধিত তালিকা প্রেরণ করার জন্য বলি।”

Link copied!