রবিবার ২১, জুন ২০২৬

রবিবার ২১, জুন ২০২৬ -- : -- --

রাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ভাবনায় বাবা দিবস

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ জুন ২০২৬, ১২:০১ এএম

সংগৃহীত ছবি

প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার পালিত হয় বিশ্ব বাবা দিবস। এ বছর দিনটি পড়েছে ২১ জুন। মা দিবসের আবেগঘন উদযাপনের তুলনায় বাবা দিবস অনেকটাই নিরবে চলে যায় ঠিক যেমন একজন বাবার ভালোবাসাও অধিকাংশ সময় থেকে যায় কথার আড়ালে, কাজের ভেতরে।

বাবা দিবসের প্রচলন শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯১০ সালে ওয়াশিংটনের স্পোকেনে সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক নারী তাঁর বাবাকে স্মরণ করে এই দিবসের প্রস্তাব দেন, যিনি স্ত্রী হারানোর পর একাই ছয় সন্তান বড় করেছিলেন। ধীরে ধীরে দিবসটি জনপ্রিয়তা পায়, এবং ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজস্ব রীতিতে দিনটি পালিত হয়।

পরিবারে বাবার ভূমিকা প্রায়ই থেকে যায় পর্দার আড়ালে। সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করা, রাত জেগে অসুস্থ সন্তানের পাশে বসে থাকা, কখনো নিজের শখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটানো—এসব গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে। বাবারা সাধারণত আবেগ প্রকাশে সংযত থাকেন, কিন্তু তাঁদের নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে গভীরতম যত্ন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে অনেক শিক্ষার্থীই প্রথমবারের মতো বাবা থেকে দূরে থাকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। হোস্টেল বা মেসে একা থাকার দিনগুলোতে বাবার ফোনকল, "টাকা পাঠিয়েছি, ঠিকমতো খেয়ো" জাতীয় সংক্ষিপ্ত অথচ যত্নে ভরা বার্তাগুলোই হয়ে ওঠে নির্ভরতার জায়গা।

রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের কাছেও বাবা দিবস বিশেষ এক অনুভূতির নাম। ক্যাম্পাস জীবনের ব্যস্ততা, পরীক্ষা আর গবেষণার চাপের মাঝেও অনেকেই এই দিনটিতে বাবাকে ফোন করে কুশল জিজ্ঞাসা করেন, কেউ বা ছুটির দিনে বাড়ি ফিরে কাটান কিছুটা সময়। বাবা দিবসে শিক্ষার্থীদের না বলা অনুভূতিগুলো তুলে ধরেছেন রাবিপ্রবি শিক্ষার্থী সীমান্ত তঞ্চঙ্গ্যা।  

বাবা দিবস নিয়ে ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী অন্যন্যা চাকমা বলেন, "বাবা এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন। তিনি হয়তো সবসময় নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করেন না, কিন্তু তাঁর প্রতিটি ত্যাগ, পরিশ্রম ও দায়িত্ববোধের মধ্যেই সেই ভালোবাসা নিঃশব্দে প্রকাশ পায়। জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে বাবার পরামর্শ, সাহস ও আশীর্বাদ আমাদের এগিয়ে চলার শক্তি জোগায়। যদিও আমাদের প্রতিটি দিনই বাবা দিবস হওয়া উচিত, তবুও Father's Day বাবার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি বিশেষ উপলক্ষ। এই দিনে আমি পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা ও অগাধ ভালোবাসা। বিশেষ করে আমার বাবার প্রতি রইল গভীর কৃতজ্ঞতা, যিনি সবসময় আমার পাশে থেকে আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন এবং সেই স্বপ্ন পূরণের সাহস জুগিয়েছেন।"

বাবাকে নিয়ে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে ফিশারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্সেস টেকনোলজি বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, "বাবা হলো ছায়ার মতন ব্যক্তি,যিনি সবসময় আমাদের পাশে থাকেন।অনেকের বাবা নেই,এদিক থেকে আমি স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞ যে আমার বাবা বেঁচে আছেন। ক্যাম্পাসে আসার পর থেকেই বাবা যখন ফোন দিয়ে খোঁজ নেন,"কেমন আছো?" তখন ইচ্ছা থাকার পরেও বাবার সাথে দেখা হয় না। ঈদের দিন বাবা একবার অশ্রুসিক্ত হয়ে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ছিলেন,তখন নিজেকে সবচেয়ে সৌভাগ্যমান মনে হয়েছিলো।আমরা ছেলেরা সবাইকে ভালোবাসি বলতে পারলেও বাবাকে কোনদিন বলতে পারি না।আমি স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করি যে,আমার বাবা যেন আমার সফলতা দেখে যেতে পারেন এবং আমি তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।বেঁচে থাকাকালীন সবাই যেন নিজ নিজ বাবা-মায়ের যত্ন নেয়।"

ফিশারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্সেস টেকনোলজি বিভাগের ১ম বর্ষের আরেকজন শিক্ষার্থী নেউন মারমা বলেন, "বাবা দিবস আমাদের সেই মানুষটির প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করার একটি বিশেষ দিন। যদিও বাবার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনের প্রয়োজন নেই, তবুও এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাবার অবদান কতটা অমূল্য।আমার বাবা কাউখালীর এক প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। তিনি প্রতিদিনই রাঙ্গামাটি সদর থেকে তার স্কুলে আসা যাওয়া করেন। তাই যাতায়াতের সুবির্ধাতে তিনি একটি সেকেন্ড হেন্ড বাইক কিনেছিলেন। উনি আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করে বাইকটা চালানো শিখেছিলেন, আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। একদিন রোজ সকালের মতোই আমি স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু সেদিন হঠাৎ বাবা বলে উঠলেন "আজ আমি তোকে বাইকে করে স্কুলে পৌঁছে দেবো"। আমিও বাবাকে মজার ছলে বলেছিলাম এটা যাতে আমার স্কুলের শেষ দিন না হয়। দিনটা আমার কাছে বিশেষ এজন্যই যে তিনি তার এই ছোট ইচ্ছেটা পূরণ করতে পেরেছিলেন।সবশেষে, বাবা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় ও অনুপ্রেরণা। বাবা দিবসে আমার প্রথম উপার্জন থেকেই বাবাকে উপহার দিয়ে দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে চাই।তাঁর ত্যাগের প্রতিদান কখনোই দেওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রতিদিনই বাবাকে সম্মান ও ভালোবাসা জানাই।"

ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী টেবিলন চাকমা বলেন, "বাবা,তুমি আমার জীবনের সেই বটবৃক্ষ। যার ছায়ায় থেকে বড় হইছি। তোমার ছায়াতলে বড় হওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য। জানিনা তোমাকে আমি কতটা গর্বিত করতে পারছি কিন্তু তোমাকে বাবা হিসেবে পেয়ে আমি গর্বিত। বাবা তুমি সুস্থ ও দীর্ঘজীবী হও। বাবা দিবসে তোমার প্রতিটি ত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার জন্য আমি চিরকৃতজ্ঞ।"

ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী হিয়া ত্রিপুরা বলেন, "প্রতিটি মেয়ের জীবনে প্রথম ভালোবাসার পুরুষ হলেন তার‌ বাবা।আমার জীবনের প্রথম ও সেরা সুপারহিরো নিঃসন্দেহে আমার বাবা।আমার কাছে বাবার সঙ্গে আমার প্রত্যেকটি মূহুর্তই স্মরণীয়।বাবা আর আমার বন্ডিং এতই ভালো যে সেখানে ফরমালিটিগতভাবে শুধু একটি দিনই স্মরণীয় হয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আমার প্রথম এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা বাবার সাথে, সেদিন ছিল বন্ধের দিন।রাবিপ্রবি নিয়ে তখন কোনো ধারণা ছিলো না তবে চয়েস লিস্টে ছিলো। একদিন বাসায় ফটোকপি দোকানে কাজের নাম করে সকাল সকাল বের হয়ে বাবা আর আমি খাগড়াছড়ি থেকে বাসে করে রাবিপ্রবি তে আসছিলাম চারপাশের পরিবেশ এবং অবস্থান দেখতে যেটা আমাদের আগের রাত থেকেই প্ল্যানিং ছিলো কিন্তু আমরা বাসায় কাউকে বলি নাই,এখনো না।তখনই আমার প্রথম রাবিপ্রবিতে আসা-বাবা আর আমার অনেকগুলো দুষ্টু-মিষ্টি মুহূর্তের মধ্যে এটি একটি। আমাদের সম্পর্ক বন্ধুর মতোই যেখানে ফরমালিটির কোনো জায়গা নেই।এখনো আমি বাড়িতে গেলে বাবা-মা কে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়। বাবার হাত ধরে রাস্তা পার হই।এটি এখন আমার কাছে নিত্যদিনের একটা ব্যাপার বিশেষ কিছু না।আগে যেমন স্কুল ছুটি হলে স্কুলের গেইট থেকে বাবা আমার কাঁধের ব্যাগ নিয়ে নিতেন এখনো ছুটিতে বাসায় গেলে বাবা আমার জন্য বাস স্টেশনে বসে থাকেন আর আমি পৌঁছালেই বাবা আমার ব্যাগ নিয়ে নেন। বাবা সবসময় আমার সবচেয়ে বড় সাপোর্ট।এই ২২ বছর বয়সে এসেও এখনো এমন কোনো দিন আসে নাই যেদিন বাবা আমাকে বকা দিয়েছে বা কথা শুনিয়েছে এমন হয়েছে।ক্যাম্পাসে থাকাকালীন আমি বাবাকে সবচেয়ে বেশি মিস করি যখন আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। যেমন—পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা বা জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারা।তখন আমার চোখে শুধু বাবার ছবি ভাসে আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ভাবি,আমার প্রতি বাবার এত বিশ্বাস-ভরসা, ভালোবাসা।বাবার বিশ্বাসের মান রাখার জন্য হলেও ভেঙে পড়লে চলবে না।জীবনে এগিয়ে যেতে হবে সঠিক গন্তব্যে, নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে-এটিই আমার খারাপ সময়ে আমার মনোবল আর সাহস হয়ে দাঁড়ায়।বাবা দিবসে একটি কথাই বলতে চাই-বাবাকে ছাড়া আজকে এই আমির কোনো অস্তিত্ব নেই,বাবাকে বাবা হিসেবে পেয়ে আমি অনেক গর্বিত।আমি চাই বাবা বুঝুক, তার প্রতিটি ত্যাগ আমার জীবনে কতটা মূল্যবান। শুধু একটি দিনের জন্য নয়, আমি চাই প্রতিদিনই যেন আমি তাকে সম্মান ও ভালোবাসা দিতে পারি।প্রতিটি দিনই আমার কাছে যেন "বাবা দিবস" হয়ে দাঁড়ায়।"

পরিশেষে বলা যায়, বাবা দিবস কেবল একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয় এটি প্রতিদিনের সেই ভালোবাসাকে একবার থেমে উপলব্ধি করার সুযোগ, যা সাধারণত আমরা পেরিয়ে যাই দ্রুত জীবনের তাড়নায়।

Link copied!