শনিবার ২৩, মে ২০২৬

শনিবার ২৩, মে ২০২৬ -- : -- --

ত্যাগের ঈদে মানবিকতার প্রতিচ্ছবি

ইয়ামিন আহমেদ,যবিপ্রবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২২ মে ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম

ঈদুল আজহা নিয়ে যবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ভাবনা। ছবি: ক্যাম্পাস রিপোর্ট

বছর ঘুরে আবারও এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা। ত্যাগ, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের মহিমায় ভাস্বর এই উৎসব মুসলিম সমাজে শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং মানবিকতা, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির এক গভীর পাঠ। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও ঈদ শিক্ষার্থীদের মনে জাগিয়ে তোলে পরিবারে ফেরা, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো এবং শৈশবের স্মৃতিময় উষ্ণতা। ঈদুল আজহার তাৎপর্য, সামাজিক মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত অনুভূতির নানা দিক নিয়ে নিজেদের ভাবনা জানিয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা। সেই অনুভূতির চিত্রই তুলে ধরেছেন ক্যাম্পাস রিপোর্ট ২৪-এর যবিপ্রবি প্রতিনিধি ইয়ামিন আহমেদ।

“কোরবানি আত্মত্যাগের প্রকৃত শিক্ষা দেয়”
সাকিবুল হাসান, ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ

মানব ইতিহাসে কিছু ঘটনা কখনো পুরোনো হয় না, কোরবানির ইতিহাস তেমনই এক অনন্য শিক্ষা। হযরত ইবরাহিম (আ.) দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রাপ্ত পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে আল্লাহর নির্দেশে কোরবানি দিতে প্রস্তুত হন। পিতা-পুত্র উভয়েই আল্লাহর আদেশে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ঠিক তখনই আল্লাহ ইসমাঈল (আ.)-এর পরিবর্তে পশু কোরবানির ব্যবস্থা করেন। এই ঘটনা শুধু ইতিহাস নয়, এটি ত্যাগ ও আনুগত্যের গভীর শিক্ষা। কোরবানির প্রকৃত অর্থ শুধু পশু জবাই নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের লোভ, অহংকার ও দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করা। প্রকৃত কোরবানি তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষের অন্তরে তাকওয়া ও আল্লাহভীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

“ঈদ মানেই প্রিয়জনদের কাছে ফেরা”
মুবাশশিরা জাহান, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ, ইংরেজি বিভাগ

ঈদ মানেই আনন্দ, ভালোবাসা আর আপনজনদের কাছে ফিরে যাওয়ার এক বিশেষ অনুভূতি। ঈদুল আযহায় শহরের মানুষ গ্রামে ফিরলে চারদিকে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। বাস, ট্রেন ও লঞ্চে মানুষের ভিড়, প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা হওয়ার অপেক্ষা সব মিলিয়ে এক আবেগঘন দৃশ্য তৈরি করে। দীর্ঘদিন পর পরিবারের সঙ্গে এক হওয়া, একসঙ্গে গল্প করা ও আনন্দ ভাগাভাগি করার অনুভূতি সত্যিই অমূল্য। ঈদ শুধু নতুন পোশাক বা কোরবানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি হৃদয়ের বন্ধনকে আরও গভীর করার সময়। ধনী-গরিব সবাই যখন একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেয়, তখনই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।

“কোরবানির হাট গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি”

শেখ আবু সুফিয়ান, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ, মার্কেটিং বিভাগ

কোরবানির পশুর হাট শুধু কেনাবেচার স্থান নয়, এটি এক উৎসবমুখর মিলনমেলা। ঈদুল আযহা এলেই হাটে নানা নামের গরু, মানুষের ভিড় ও কোলাহলে পুরো পরিবেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। গ্রামের গৃহস্থদের কাছে পশুগুলো পরিবারের সদস্যের মতোই। অনেক পরিবার সারাবছর পরিশ্রম করে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ কিংবা ভবিষ্যতের স্বপ্ন পূরণের আশায় পশু লালন-পালন করেন। নিজের হাতে আদর-যত্নে বড় করা পশু বিক্রি করতে এসে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অন্যদিকে ক্রেতারাও ব্যস্ত থাকেন পশু বাছাই, দামদর ও পশুর স্বাস্থ্য যাচাইয়ে। সব মিলিয়ে কোরবানির হাট গ্রামীণ জীবনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

“কোরবানি সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়”
জান্নাতুন ফেরদৌস, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগ

ঈদুল আযহা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি ত্যাগ, ধৈর্য, আনুগত্য ও মানবতার চিরন্তন শিক্ষার প্রতীক। কোরবানির মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় জিনিস ত্যাগ করার শিক্ষা লাভ করে এবং আত্মত্যাগের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শেখে। এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় শিক্ষা শুধু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা মানুষের নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোরবানির মাংস গরিব ও অসহায় মানুষের মাঝে বিতরণের মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও পরোপকারিতার মানসিকতা আরও দৃঢ় হয়। ফলে সমাজে শান্তি, সৌহার্দ্য ও সামাজিক ঐক্য বৃদ্ধি পায়।

“ঈদের আনন্দের সঙ্গে পরিবেশ সচেতনতা জরুরি”
মো. রেদওয়ান আহমেদ, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ, ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ

ঈদুল আযহা আমাদের জীবনে ত্যাগ, আনন্দ ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আসে। তবে এই আনন্দের পাশাপাশি কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশুর রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ও অন্যান্য বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে না ফেলে যেখানে-সেখানে ফেললে তা দ্রুত দুর্গন্ধ ছড়ায় এবং রোগজীবাণুর সৃষ্টি করে পরিবেশকে অস্বাস্থ্যকর করে তোলে। তাই আমাদের সবার উচিত নির্ধারিত স্থানে পশু জবাই করা এবং সঠিকভাবে বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করা। ঈদের আনন্দ তখনই সত্যিকার অর্থে সুন্দর হবে, যখন আমরা আনন্দের পাশাপাশি পরিবেশের প্রতিও যত্নশীল হব।

“গ্রামের ঈদে থাকে আলাদা উষ্ণতা”
ফারজানা আফরিন জ্যোতি, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ

গ্রামে ঈদের আনন্দটা বেশি খাঁটি ও আন্তরিক মনে হয়। সকালে ঈদের নামাজ, কোলাকুলি, পরিচিত মানুষের হাসিমুখ আর মায়ের হাতের সেমাইয়ের স্বাদে ভরে ওঠে পুরো বাড়ি। আত্মীয়দের সঙ্গে হেঁটে বা সাইকেলে ঘোরা, সবুজ মাঠ আর নদীর ধারে ঈদের মুহূর্তগুলো যেন আলাদা সৌন্দর্য তৈরি করে। অন্যদিকে শহরের ঈদে আধুনিকতার ছোঁয়া বেশি থাকে। নতুন জামা, বড় মসজিদ, শপিংমল ও রেস্টুরেন্টের ব্যস্ততার মাঝেও কোথাও যেন গ্রামের সহজ-সরল উষ্ণতাটা খুঁজে পাওয়া যায় না। তবুও গ্রাম ও শহর দুই জায়গাতেই ঈদ আমাদের শেখায়, আনন্দ একই থাকে, শুধু তার রূপ ভিন্ন হয়।

Link copied!