প্রকাশিত: ২২ মে ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) নির্মাণাধীন লন্ড্রি, সেলুন ও ফটোকপির রুমের কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, অনুমতি ছাড়াই ঢালাই কার্যক্রম পরিচালনা এবং পাশাপাশি কাজের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীদের যথাযথ দায়িত্ব পালনেও অবহেলার ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর সূত্রে জানা যায়, টেন্ডার আইডি-১২০৭০৪৯ এর আওতায় ক্যাম্পাসে লন্ড্রি, সেলুন ও ফটোকপিয়ার রুম নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে রাজশাহীভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘গিভ এন্ড টেইক কন্সট্রাকশন’। যার দরপত্রের মূল্য প্রায় বিশ লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। গত ১৭ মে জারি করা এক অফিস আদেশে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সিডিউল বহির্ভূতভাবে কাজ সম্পাদনের অভিযোগ আনা হয়।
নির্মাণাধীন ভবনের গ্রেড বিম ঢালাই কাজে সিলেট স্যান্ড ব্যবহারের কথা থাকলেও তার পরিবর্তে মাটি মিশ্রিত ফিলিং বালি ব্যবহার করা হয়েছে। অপরিষ্কার খোয়া ব্যবহার করায় রাবিশের পরিমাণ বেশি হয়েছে - যা কলাম ঢালাইয়ের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়াও, ঢালাইয়ের পূর্বে প্রকৌশল দপ্তরের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেই নিয়মও লঙ্ঘন করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীর সূত্রে জানা যায়, গতকাল বিকালে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে ঢালাইয়ের মশলা মিক্সিংয়ের সময় ইঞ্জিনিয়ার উপস্থিত না থাকায় একজন ছাত্র প্রতিনিধি সেই কাজে বাধা দেয়। এরপরে সেদিন ঢালাই না দিয়ে শ্রমিকগণ ফিরে যান। তবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ঢালাই কাজের পারমিশনের জন্য দুইবার ইঞ্জিনিয়ারের কাছে গেলেও তিনি সাড়া দেননি। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়াররা কাজ বন্ধ করার বিষয়ে ঠিকাদারকে কিছুই বলেনি।
গত সোমবার (১৭ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুল লতিফ স্বাক্ষরিত একটি পত্রে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। নোটিশে তিনটি বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে কেন নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, কেন ঢালাইয়ের পূর্বে অনুমতি নেওয়া হয়নি এবং কেন টিলা কেটে ভিটি ভরাট করা হয়েছে। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে এসব অভিযোগের জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্রিয়াশীল সংগঠনের সদস্যরা উপাচার্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে দাবি করেন, চলমান উন্নয়নকাজে অনিয়ম হচ্ছে এবং এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের কিছু দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নির্মাণকাজে নিম্নমানের বালি ব্যবহারের পাশাপাশি পাশের পাহাড় বা টিলা কেটে মাটি এনে ভরাট করা হয়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ সংগঠনের সংশ্লিষ্টদের মতে, টিলা বা পাহাড় কাটা শুধু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে না, এটি দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধও। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী পাহাড় বা টিলা ধ্বংস পরিবেশবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। ফলে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিষয়টি প্রশাসনিক অনিয়মের পাশাপাশি পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের ঘটনাও হিসেবে গণ্য হতে পারে।
নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও কাজ বন্ধ রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল বাশার বলেন, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজে যদি সিডিউল বহির্ভূতভাবে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়, তবে তা শুধু অবকাঠামোগত ঝুঁকিই তৈরি করবে না, বরং রাষ্ট্রীয় অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারের প্রশ্নও সামনে আনবে। তার মতে, বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুল লতিফ বলেন, প্রতিটি ঢালাইয়ের পূর্বে ইঞ্জিনিয়ার দপ্তর থেকে একটি সার্টিফিকেট নিতে হয় কিন্তু তিনি তা নেননি। গত বৃহস্পতিবার বিকাল চারটায় একটি ঢালাই দিয়েছে সেটার অনুমতিও নেয়নি এবং গতকালও ঢালাইয়ের কাজ শুরু করার আগে পারমিশন নেয়নি।
এছাড়াও তিনি আরও বলেন, তার ব্যবহৃত খোয়া, বালি নিম্নমানের। খোয়া ঠিকমতো পরিষ্কার না করা রাবিশ থেকে যায়, যা কলাম ঢালাইয়ের জন্য ক্ষতিকর।
এ বিষয়ে প্রজেক্ট ম্যানেজার এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, আমি প্রজেক্টের দায়িত্বে আছি। কাজের শুরু থেকে একই নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। তখন কোনো প্রোবলেম আসেনি। ঢালাই কাজের জন্য আমি পারমিশনও দিয়েছি। সে আমাদের এখানে কাজ করতে এসেছে কিন্তু প্রতিটি দপ্তরে দপ্তরে সে কেন যাবে।
কাজের ঠিকাদার সানাউল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমি কাজ করার সময়ে সাইট ইঞ্জিনিয়ার বিল্লাল সাহেবের সাথে যোগাযোগ করি। আমি দুই-দুইবার পারমিশনের জন্য ইঞ্জিনিয়ারের কাছে গিয়েছি কিন্তু তিনি আসেননি। আমার পক্ষে প্রতিটি দপ্তরে গিয়ে গিয়ে পারমিশন আনা সম্ভব না। তাছাড়া সাইট ইঞ্জিনিয়ার আমাকে পারমিশন দিয়েছে।
নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি শুরু থেকেই একই খোয়া, বালি ও সিমেন্ট ব্যবহার করছি। উনারা এগুলো দেখেছেন। তারপরও যদি তাদের মনে হয় যে নিম্নমানের জিনিস এগুলো তাহলে তারা পরীক্ষা করতে পারেন। বাশার ভাই এসে ইঞ্জিনিয়ারদের উপস্থিতি না থাকায় কাজ বন্ধ রাখতে বলেন। তখন আমরা ইঞ্জিনিয়ার দপ্তরে যাই সেখান ইঞ্জিনিয়ার লতিফ সাহেবের সাথে কথা হয়েছে। অল্প সময়ের জন্য ইঞ্জিনিয়ার শহীদুল সাহেবের সাথেও কথা হয়েছে।
তবে বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এস এম শহীদুল হাসান। তিনি বলেন, আমি এবিষয়ে তেমন কিছু জানি না। সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করুন। পাশাপাশি ঠিকাদারের সাথে দেখা হওয়ার বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন।
