প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২০ পিএম
শিশুকে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দিলেই কি তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সম্ভব? পড়াশোনার পাশাপাশি তার মনোজগত, চিন্তাশক্তি, আচরণ, মূল্যবোধ ও শেখার ধরনকে গুরুত্ব দেওয়া কতটা জরুরি এমন ভাবনা থেকেই ঝিনাইদহে ভিন্নধারার শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে আন নাজাত মডেল মাদ্রাসা।
২০২২ সালে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে প্লে, নার্সারি, কেজি থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা-ভাবনায় সাধারণ ও আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে কোরআন-হাদিস ও ইসলামি মূল্যবোধের সমন্বয়ের পাশাপাশি শিশুর মনোবিকাশ, চিন্তাশক্তি, শেখার দক্ষতা ও চরিত্র গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি শিশু একইভাবে শেখে না। কারও মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হয়, কেউ দ্রুত কিছু মনে রাখতে পারে না, আবার কেউ বিষয় বুঝলেও নিজের চিন্তা বা অনুভূতি প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করে। ফলে শুধু পরীক্ষার ফলাফল নয়, শিশুর শেখার প্রক্রিয়া, মানসিক বিকাশ ও ব্যক্তিগত সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম সাজানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
শ্রেণিকক্ষে শিশুমনোবিজ্ঞানের প্রয়োগ
আন নাজাত মডেল মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শিশুমনোবিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশুর বয়স, মানসিক বিকাশ, মনোযোগ, আচরণ ও শেখার পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ জন্য শিক্ষকদের পাঠ পরিকল্পনা, কার্যকর শ্রেণি পরিচালনা এবং শিশুমনোবিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন কৌশল বিষয়ে উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় আনার উদ্যোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, শিক্ষক যেন শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু পড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকেন; বরং শিশুর শেখার প্রক্রিয়ার সহায়ক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
মনোযোগ, স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি বিকাশে বিশেষ কার্যক্রম
শিক্ষার্থীদের মেধা ও শেখার দক্ষতা বিকাশে প্রতিষ্ঠানটি আন নাজাত ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম নামে একটি পৃথক কার্যক্রমের কাঠামো তৈরি করেছে।
এই কার্যক্রমে মূলত পাঁচটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে,
মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি, শেখার দক্ষতা এবং পরীক্ষার দক্ষতা।
বিভিন্ন খেলা ও কার্যক্রমভিত্তিক অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা, তথ্য মনে রাখা, বিষয় বিশ্লেষণ করা এবং শেখার কৌশল আয়ত্ত করার চেষ্টা করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে, শিক্ষার্থীদের সামনে বিভিন্ন দৈনন্দিন সামগ্রী পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিয়ে পরে সেগুলো মনে করতে বলা হয়। বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী অনুশীলনের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষা কার্যক্রমে অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা
শিশুর শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এই ধারণা থেকেই অভিভাবকদেরও শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ করার চেষ্টা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ লক্ষ্যে আয়োজন করা হয়েছে প্যারেন্টিং ওয়ার্কশপ। এসব কর্মশালায় শিশুদের মোবাইল ফোন ব্যবহার, পড়াশোনা, বাড়ির কাজ এবং শিশুর প্রতি অভিভাবকের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যালয়ে একটি শিশুকে যে পরিবেশ দেওয়া হচ্ছে, বাড়িতে যদি তার সম্পূর্ণ বিপরীত পরিবেশ থাকে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন। তাই শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ইংরেজি ও আরবি ভাষায় দক্ষতা তৈরির চেষ্টা
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কথ্য ইংরেজি ও কথ্য আরবি ভাষায় দক্ষ করে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ভাষা শিক্ষাকে শুধু বই ও পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যবহারিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা রয়েছে। ছোট বয়স থেকেই শোনা, বলা ও দৈনন্দিন ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভাষার সঙ্গে পরিচিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ইসলামি মূল্যবোধ
আন নাজাত মডেল মাদ্রাসার শিক্ষা-দর্শনে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামি মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তার আচরণ, দায়িত্ববোধ, সততা, অন্যের প্রতি সম্মান এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই ধারণা থেকেই সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে ইসলামি শিক্ষা ও মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণেও বিশেষ গুরুত্ব
শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা বাস্তবায়নে শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় শিক্ষক উন্নয়ন কার্যক্রমকেও প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ করা হয়েছে।
শিক্ষকদের শিশুমনোবিজ্ঞান, কার্যকর শ্রেণি পরিচালনা ও পাঠ পরিকল্পনা বিষয়ে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়াতে কার্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা এবং পরিকল্পিত পাঠদানের ওপরও কাজ করা হচ্ছে।
সাফল্যে বৃত্তি অর্জন
২০২২ সালে যাত্রা শুরুর পর ধীরে ধীরে শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে আন নাজাত মডেল মাদ্রাসা। বর্তমানে প্লে থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ইবতেদায়ি সরকারি বৃত্তি পরীক্ষায় আটজন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে আটজনই সরকারি বৃত্তি লাভ করেছে।
এ ছাড়া ঝিনাইদহ জেলার প্রথম মাদ্রাসা হিসেবে কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হয়ে প্রতিষ্ঠানটি অ্যাসোসিয়েশনের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। সাধারণ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় প্রতিবছরই শিক্ষার্থীরা সাফল্য অর্জন করছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটির ৬৩ শিক্ষার্থী মেধাবৃত্তি লাভ করেছে।

‘ভালোবাসা, কোমল আচরণ ও মানসম্মত শিক্ষা’
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা-দর্শনের মূল ভাবনা হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে ‘ভালোবাসা, কোমল আচরণ ও মানসম্মত শিক্ষা।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুকে ভয় দেখিয়ে কিংবা অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে নয়; বরং তার মন বুঝে, তাকে সম্মান দিয়ে এবং শেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি করে শিক্ষা দেওয়ার পরিবেশ গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।
প্রতিষ্ঠানটির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে একদিকে শ্রেণি ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষা পদ্ধতিকে আরও কাঠামোবদ্ধ করার কাজও চলছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুকেন্দ্রিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা দীর্ঘমেয়াদি বাস্তব ফলাফলের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। তবে ঝিনাইদহের স্থানীয় শিক্ষা পরিসরে শিশুর মনোবিকাশ, দক্ষতা উন্নয়ন, মূল্যবোধের শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও অভিভাবক সম্পৃক্ততাকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগটি একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাচিন্তার পরিচয় দিচ্ছে।

