প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৮ এএম
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম নারী শহীদ বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের ৯৪তম আত্মাহুতি দিবস উপলক্ষে তাঁর অবিনাশী সংগ্রামী চেতনা ও বর্তমান সময়ে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা সভা ও মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচি পালন করেছে গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শাখা।
আজ ২৪ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এ কর্মসূচি শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে শেষ হয়। কর্মসূচিতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলন, চট্টগ্রাম মহানগরের সহ-সভাপতি মাহিদুল ইসলাম ইবাদ। এতে গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের চবি শাখার নেতৃবৃন্দসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সাহসী বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে সশস্ত্র অভিযান চালায় একদল তরুণ বিপ্লবী। তাঁদের সেই দুর্বার অভিযানে কেঁপে ওঠে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতীকী অহম ও দাম্ভিকতা। ক্লাবের সম্মুখে ঝোলানো ‘কুকুর এবং ভারতীয় প্রবেশ নিষেধ’ লেখা ঔপনিবেশিক ঘৃণার প্রতীকও ভেঙে পড়ে।
আলোচনা সভায় গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের নেতৃবৃন্দ বলেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের দারুণ আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার সুফল ক্রমেই কিছু পুঁজিবাদী ও স্বার্থান্বেষী মহলের কুক্ষিগত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজের বাস্তবতার দূরত্ব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর ফলে জনগণের মধ্যে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার চেতনার পরিবর্তে এক ধরনের হতাশা, নিষ্ক্রিয়তা এবং পরিস্থিতিকে মেনে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, এমন এক অস্থির ও সংকটময় সময়ে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জীবন ও সংগ্রাম আমাদের সামনে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। প্রীতিলতা আমাদের মনে করিয়ে দেন, অন্যায়কে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াই মানুষের মূল দায়িত্ব। ঔপনিবেশিক শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর এই মহান আত্মত্যাগ আজও নতুন প্রজন্মের কাছে প্রতিবাদ, সাহস ও আত্মমর্যাদার অবিনাশী অনুপ্রেরণা।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে নারীদের সামাজিক অবস্থান তুলে ধরে উপস্থিত ছাত্রনেতারা বলেন, বর্তমানে নারীরা বিশেষভাবে নানা ধরনের বৈষম্য ও সামাজিক নিপীড়নের মুখোমুখি হচ্ছেন। নারীর লৈঙ্গিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে স্লাট-শেমিং, চরিত্রহনন, সামাজিক হেনস্তা এবং নানা কৌশল অবলম্বন করে তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। অথচ যেকোনো গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণের সংগ্রামে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। প্রীতিলতার সংগ্রামী চেতনা সেইসব নিপীড়িত নারীর জন্য সাহস ও প্রতিরোধের প্রধান উৎস হতে পারে।
সমাবেশ থেকে আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, প্রীতিলতাকে কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের চরিত্র হিসেবে আবদ্ধ রাখলে তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান জানানো হবে না। বর্তমানের অন্যায়, বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের মাঝে প্রতিবাদী চেতনা জাগিয়ে তোলার মধ্য দিয়েই তাঁর সংগ্রামকে ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও সংগ্রামী নারীদের মধ্যে প্রীতিলতার সাহস, আত্মমর্যাদা ও প্রতিরোধের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়াই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
আলোচনা সভা শেষে চবির শহীদ মিনারে মোমবাতি প্রজ্বলন করে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারসহ সকল বীর সংগ্রামীর আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়। একইসঙ্গে সমাজে চলমান সব ধরনের অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
