বুধবার ১৯, আগস্ট ২০২৬

বুধবার ১৯, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের পরিবার টার্গেট করে ডিজিটাল প্রতারণা

ফাইল ফটো

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে নতুন কৌশলে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। নিজেদের ডিবি পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে শিক্ষার্থীকে মাদকসহ আটক করার মিথ্যা তথ্য দিয়ে কিংবা শিক্ষার্থী বা তার বাবা-মায়ের দুর্ঘটনার খবর জানিয়ে ফোন কলে টাকা দাবি করছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের একাধিক পোস্টে এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগ উঠে এসেছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রতারকরা ফোন করে দাবি করছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে ইয়াবাসহ আটক করা হয়েছে, তার মোবাইলে জুয়ার অ্যাপ পাওয়া গেছে কিংবা কোনো অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর দ্রুত টাকা পাঠানোর জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। টাকা না দিলে মামলা, কারাগারে পাঠানো, নির্যাতন কিংবা ক্যারিয়ার নষ্ট করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য শিক্ষার্থী বা পরিবারের সদস্যের কণ্ঠস্বরের মতো কান্নার শব্দও শোনানো হচ্ছে।

ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষের র্শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন নাবিল জানান সম্প্রতি তার বাবার কাছে অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে নিজেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেওয়া হয়। ফোনে তার বাবাকে জানানো হয় নাবিলকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে ইয়াবা ও ফোনে জুয়ার অ্যাপসহ আটক করা হয়েছে। দ্রুত টাকা না দিলে তার ক্যারিয়ার ধ্বংস এবং বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ করার হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ফোনে তার কণ্ঠস্বরের মতো কান্নার শব্দ শোনানো হলে তার বাবা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। প্রতারকদের মানসিক চাপে নিজের ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না পেয়েই কয়েকটি দোকান থেকে বিকাশের মাধ্যমে মোট ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন তিনি। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যাই নাবিল বন্ধুদের সঙ্গে উৎমাছড়া ঘুরতে গিয়েছিলেন এবং সম্পূর্ণ নিরাপদে ছিলেন। এ ঘটনায় তার পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে।

অন্য একটি ঘটনায়, ক্যাম্পাস থেকে বাড়ি ফেরার পথে এক শিক্ষার্থী গভীর রাতে তার বোনের বাসায় পৌঁছান। ভোরে তার মায়ের কাছে ‘ডিবি পুলিশ’ পরিচয়ে ফোন করে প্রতারকরা দাবি করে, ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ওই শিক্ষার্থীকে ভৈরব থেকে অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আটক করা হয়েছে। ১ লাখ টাকা না দিলে তাকে প্রাণে মেরে ফেলা কিংবা ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য ফোনে ওই শিক্ষার্থীর কণ্ঠস্বর নকল করে কান্নার শব্দও শোনানো হয়। পরে আত্মীয়দের মাধ্যমে ওই শিক্ষার্থী নিরাপদে আছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেলে পরিবারটি প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পায়। এ ঘটনায় ০১৮৭৩৬৩৭৬২৩, ০১৬১৭৭৮৯২৩৫ ও ০১৬২৩৮৮২৩৯৩ নম্বরগুলো থেকে কল করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

শুধু শিক্ষার্থীকে আটকের মিথ্যা তথ্য নয়, বাবা-মায়ের দুর্ঘটনার খবর দিয়েও শিক্ষার্থীকে প্রতারণার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি এক শাবিপ্রবি শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, রাত ৮টার দিকে  ০১৮১২৭৫৩৪৩৭ নম্বর থেকে তার কাছে ফোন আসে। ফোনদাতা নিজেকে কামাল নামে পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, তিনি ওই শিক্ষার্থীর বাবার কলিগ। এরপর জানানো হয়, তার বাবা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন। চিকিৎসা ও হাসপাতাল সংক্রান্ত কাজে দ্রুত ১৪ হাজার ৫০০ টাকা পাঠাতে বলা হয়। বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য করতে ফোনের মধ্যেই ওই শিক্ষার্থীর বাবার কণ্ঠস্বরের মতো একটি কণ্ঠ শোনানো হয়।
ওই শিক্ষার্থী জানান, কিছুদিন আগে  শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট ফেসবুক গ্রুপ ‘আমরা সাস্টিয়ান’ এ একই ধরনের প্রতারণার ঘটনা সম্পর্কে পোস্ট দেখায় তার সন্দেহ হয়। তিনি বাবার নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তখন ফোন বন্ধ পান। পরে জানতে পারেন, একই প্রতারকচক্র তার বাবাকেও ফোন করে জানিয়েছে যে তিনি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন এবং তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য ২৫ হাজার ৫০০ টাকা পাঠাতে হবে। পরবর্তীতে বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে দুজনেই নিশ্চিত হন, পুরো ঘটনাটিই সাজানো প্রতারণা।

আরেক শাবিপ্রবি শিক্ষার্থী প্রিয়াঙ্কা ঘোষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, প্রায় এক থেকে দেড় মাস আগে তার কাছেও একই ধরনের ফোন এসেছিল। ফোনদাতা দাবি করেন, তার বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য একজনের কণ্ঠস্বর শুনিয়ে সেটিকে তার বাবার কণ্ঠ বলে দাবি করা হয়। তবে প্রিয়াঙ্কা কণ্ঠটি তার বাবার নয় বুঝতে পারেন। পরে তিনি বাবার নম্বরে ফোন করে নিশ্চিত হন, কোনো দুর্ঘটনাই ঘটেনি।
তিনি জানান, যে নম্বরে কল করা হয়েছিল সেটি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাগজপত্র এবং বাবা-মা ছাড়া খুব বেশি মানুষের কাছে ছিল না। ফলে প্রতারকরা কীভাবে ওই নম্বর সংগ্রহ করেছে তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।

শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের প্রতারণা নিয়ে একাধিক সতর্কতামূলক পোস্ট ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাগুলোর ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতারকরা ভুক্তভোগী পরিবারের উদ্বেগ ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে। কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়,  কখনো দুর্ঘটনার খবর এবং কখনো কণ্ঠস্বর নকল করে পরিস্থিতিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. মোখলেসুর রহমান জানান, এ বিষয়ে তারা এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের ওই শিক্ষার্থীর সাথে ঘটা প্রতারণামূলক ঘটনাগুলো সম্পর্কে তারা অবগত আছেন।

​তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিজস্ব কোনো সাইবার ক্রাইম তদন্ত ইউনিট বা কারিগরি সক্ষমতা নেই। তবে শিক্ষার্থীরা জিডির কপি বা লিখিত অভিযোগ দিলে স্থানীয় থানা, সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ প্রশাসন এবং পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সাথে কথা বলে আইনানুগ সহায়তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।

​শিক্ষার্থীদের গোপন ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রতারকদের হাতে পৌঁছানো প্রসঙ্গে প্রক্টর বলেন, ওয়েবসাইটে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ তথ্যগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত। তবে কোনো শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট সময়ে কোথায় আছেন বা তার ফোন অফ থাকার সূক্ষ্ম তথ্যগুলো যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে ঘনিষ্ঠ বা পরিচিত কারও সম্পৃক্ততার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষে এককভাবে সংঘবদ্ধ এ ধরনের প্রতারণা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। তাই শিক্ষার্থীদের নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবারের সদস্যদের এ ধরনের প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে আগে থেকেই সচেতন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্যাম্পাস থেকে দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের পরিবারের উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধভাবে এসব প্রতারণা চালানো হচ্ছে। তারা এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাইবার অপরাধ দমন সংশ্লিষ্ট সংস্থার দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Link copied!