বুধবার ১৯, আগস্ট ২০২৬

বুধবার ১৯, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

যেভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ে কলকাতার সেই হোটেলে

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৬ পিএম

ফাইল ফটো

কলকাতার নিউ মার্কেটের পার্শ্ববর্তী মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে।

কলকাতা ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে নিহত সবাই বাংলাদেশি বলে জানানো হলেও তাদের পরিচয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। নিহতদের পরিচয় শনাক্তে বাংলাদেশ হাইকমিশন ও কলকাতা পুলিশ কাজ করছে।

মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টার দিকে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই হোটেলের তৃতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন তৃতীয় তলার অন্তত চারটি কক্ষে ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুরো ভবনে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এর মধ্যেই হোটেলের একটি অংশ পুড়ে যায় এবং প্রাণ হারান ৯ জন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আগুন লাগার সময় হোটেলের বিভিন্ন কক্ষে অনেকেই ঘুমিয়ে ছিলেন। বাইরে থেকে আগুনের শিখা খুব একটা দেখা না গেলেও প্রচুর কালো ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ফলে আগুনের বিষয়টি বুঝতে এবং নিরাপদে বের হতে অনেকের সময় লেগে যায়। ঘন ধোঁয়ার কারণে অনেকে বের হওয়ার পথও খুঁজে পাননি।

হোটেলটির ভবন পাঁচতলা। প্রতিটি তলাতেই বিভিন্ন হোটেল রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, ভবনের কোনো তলাতেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। হোটেলের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথও ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর এ কারণে ভেতরে হুড়োহুড়ির পরিস্থিতি তৈরি হয়।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বাইরে থাকা ডেকোরেশনের অংশ ভেঙে মই দিয়ে হোটেলের ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর একে একে আটকে পড়াদের উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে ভবনের ভেতরে জমে থাকা ধোঁয়া বের করে দেওয়ার কাজও চলে। এখন পর্যন্ত ভবনটি থেকে প্রায় ৬০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের অনেকেই অসুস্থ ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

আহতদের মধ্যে ছয়জনের অবস্থা গুরুতর। তাদের কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও এসএসএম হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। নিহতদের শরীরে পোড়ার চিহ্ন থাকলেও চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, আগুনের চেয়ে ধোঁয়ার কারণে শ্বাসরোধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

প্রাথমিকভাবে হোটেলের একটি এসি থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। এ ঘটনায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস তদন্ত শুরু করেছে।

ঘটনাস্থল মির্জা গালিব স্ট্রিট কলকাতার নিউ মার্কেটের একেবারে পাশেই। নিউ মার্কেটের পেছনের অংশ ও আশপাশের কয়েকটি প্রধান গলি সরাসরি মির্জা গালিব স্ট্রিটের সঙ্গে যুক্ত। এ এলাকায় বাংলাদেশি নাগরিকদেরও নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে।

ঘটনার পর পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। হোটেলের মালিক ও কয়েকজন কর্মী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। ফলে হোটেলে থাকা আবাসিকদের তালিকা সংগ্রহ ও তাদের পরিচয় শনাক্তের কাজেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত জানা গেছে, হোটেলে প্রায় ১৯ জন আবাসিক ছিলেন। পুরো ভবনে প্রায় ৬০ জন অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার পর হোটেলটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, হোটেলটির পাশের ভবনেই ফায়ার ব্রিগেডের একটি বড় অফিস রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের কার্যালয়ের এত কাছে থাকা সত্ত্বেও হোটেলগুলোতে যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কেন ছিল না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নিউ মার্কেট হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা প্রতিবছর হোটেলগুলোর নিরাপত্তা অডিট করে থাকে। তবে গত এক বছর নির্বাচনকালীন ব্যস্ততার কারণে সেই নিরাপত্তা অডিট সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টিও এখন তদন্তের আওতায় আসছে।

সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে (পিটিআই) দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ঘন ধোঁয়ার কারণে শুরুতে দমকলকর্মীরা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারছিলেন না।

এদিকে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ হাইকমিশন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক থাকলে তাদের পরিবার ও স্বজনদের কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে পরিচয় নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে পুলিশ এখনো হাইকমিশনকে নিহতদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে জানায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্রুত ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোয় আরও বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। সরু গলি ও সংকীর্ণ সিঁড়ির কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে। আগুন লাগার সময় অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

Link copied!