প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) লোক প্রশাসন বিভাগের প্রভাষক রিফা তাসফিয়ার বিরুদ্ধে একাডেমিক, প্রশাসনিক ও আচরণগত বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিভাগের পক্ষ থেকে গত ১৮ জুন উপাচার্যের কাছে এসব অভিযোগের বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানোর প্রায় সাড়ে তিন মাস পর এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো।
বিভাগীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১০ আগস্ট লোক প্রশাসন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই রিফা তাসফিয়ার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির একাধিক সভায় আলোচনা এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও অভিযোগের অবসান হয়নি বলে বিভাগের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১৮ জুন বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক ড. হরে কৃষ্ণ কুন্ড উপাচার্যের কাছে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠান। এতে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিভাগীয় সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী পরিস্থিতির বিবরণ তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা রিফা তাসফিয়ার নেওয়া PA-404: Public Sector Management in Bangladesh কোর্স বর্জন এবং তাকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে প্রত্যাহারের আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির জরুরি সভায় কোর্সটি অন্য একজন শিক্ষকের কাছে হস্তান্তর এবং তার তত্ত্বাবধানে থাকা টার্ম পেপারের শিক্ষার্থীদের অন্য শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে ওই সময় তাকে একাডেমিক দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের আবেদনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় কমিটি।
পরবর্তীতে একই ধরনের অভিযোগ ওঠে বিভাগের উইকেন্ড প্রোগ্রামেও। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ২৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা রিফা তাসফিয়ার আচরণ নিয়ে অভিযোগ তুলে কোর্স শিক্ষক পরিবর্তনের আবেদন করেন। ২৪ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উইকেন্ড প্রোগ্রামের সমন্বয় কমিটির সভায় তাকে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হলেও তিনি উপস্থিত হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে পরবর্তী ব্যাচগুলোতে তাকে উইকেন্ড প্রোগ্রামে পাঠদানের দায়িত্ব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে পাঠদানে আরও মনোযোগী ও নিয়মানুবর্তী হওয়ার পরামর্শ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিভাগীয় একাডেমিক কমিটিও এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে।
বিভাগের পাঠদান কার্যক্রম নিয়েও প্রতিবেদনে অসন্তোষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গত ১৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিভাগের ১৫০তম একাডেমিক কমিটির সভায় রিফা তাসফিয়ার পাঠদান করা কয়েকটি কোর্সের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
অভিযোগ করা হয়, তৃতীয় বর্ষের PA-301 ও PA-309 কোর্সে পাঁচ মাস পার হলেও কোনো টিউটোরিয়াল পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে ঈদুল ফিতরের ছুটির পর ২৯ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি কোনো ক্লাস নেননি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চতুর্থ বর্ষের PA-404 কোর্সের একাডেমিক কার্যক্রম যথাযথভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সভায় অসন্তোষ প্রকাশ করা হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভাগের ১৪৯তম একাডেমিক কমিটির সভার ই-মেইল নোটিশের জবাবে শিক্ষকদের উদ্দেশে রিফা তাসফিয়া ‘Two academic committee meetings within less than one month! Department on fast track to success’ মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিভাগের শিক্ষকেরা ওই মন্তব্যকে আপত্তিকর হিসেবে বিবেচনা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কাছে ব্যাখ্যা ও লিখিত জবাব চাওয়া হয় এবং ১২ মে পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি কোনো জবাব দেননি বলে বিভাগীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির ১৫১তম সভায় রিফা তাসফিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও এর আগে নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় কয়েকজন শিক্ষক কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের পরামর্শ দেন। অন্যরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কয়েকজন শিক্ষক তার আচরণে মানসিক সমস্যার লক্ষণ থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দেন। তবে এটি শিক্ষকদের মন্তব্য; কোনো চিকিৎসাগত মূল্যায়নের তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে শেষবারের মতো রিফা তাসফিয়ার সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য অধ্যাপক ড. মো. নুরুল আমিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি রিফা তাসফিয়ার বাবার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও পরে আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে বিভাগীয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে বিভাগের তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক ড. হরে কৃষ্ণ কুন্ড বলেন, “শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল রিফা তাসফিয়ার বিরুদ্ধে। এর ভিত্তিতে বিভাগের একাডেমিক কমিটির সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উপাচার্যের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয় এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।”
তিনি বলেন, “বর্তমানে আমি আর বিভাগের সভাপতি নই। তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানি না। তবে প্রশাসন থেকে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
অভিযোগের বিষয়ে প্রভাষক রিফা তাসফিয়ার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে অন্য একটি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আমাকে অফিসিয়ালি কোনো কিছু জানানো হয়নি যে, আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।”
এদিকে অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. শামছুল আলম বলেন, “লোক প্রশাসন বিভাগের প্রভাষক রিফা তাসফিয়ার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে, তা তদন্ত করতে আজই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. খন্দকার মোহাম্মদ শরিফুল হুদাকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. তমালিকা সুলতানা এবং দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা নাজমুল মানসুর। লুৎফর রহমান আরিফকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।
কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
