প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪০ এএম
হুমায়ুন কবির সবুজ
ঢাকা, ১৬ আগস্ট: চুক্তি স্বাক্ষরের ১০ থেকে ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও অসংখ্য গ্রাহককে ফ্ল্যাট ও প্লট বুঝিয়ে না দেওয়ার অভিযোগে আবাসন প্রতিষ্ঠান ডোম-ইনো লিমিটেডে অস্থায়ী লিকুইডেটর বা অবসায়ক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
রাজধানীর শান্তিনগরে ডোম-ইনো প্রমেসা প্রকল্পের ৭৩ জন ভুক্তভোগী ফ্ল্যাট ক্রেতার করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এ আদেশ দেন। ক্রেতাদের অভিযোগ, তারা ফ্ল্যাটের প্রায় পুরো মূল্য পরিশোধ করলেও নির্ধারিত সময়ের ১০ বছর পরও ফ্ল্যাটের দখল পাননি।
দীর্ঘ শুনানি শেষে বিচারপতি সিকদার মাহমুদুর রাজি-এর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৯ আগস্ট এ আদেশ দেন। আদালত বলেন, আপাতত আদালত কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত অস্থায়ী অবসায়ক ডোম-ইনো প্রমেসা প্রকল্পের পুরো দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। একই সঙ্গে ডোম-ইনোর অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত প্লট মালিক ও ফ্ল্যাট ক্রেতারাও একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হলে তাদের বিষয় বিবেচনা করা হবে বলে জানান আদালত।
আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করা আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. নজরুল ইসলাম খান বলেন, শুনানির সময় ডোম-ইনোর বিরুদ্ধে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্র ও অনলাইন প্রতিবেদনের বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হয়। অস্থায়ী অবসায়ক নিয়োগের আবেদনের পক্ষে তিনি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের আদালতের মামলার নজিরও তুলে ধরেন।
আবেদনকারীদের অভিযোগ, অনেক গ্রাহক ফ্ল্যাটের নির্ধারিত মূল্যের বেশিরভাগ অর্থ পরিশোধ করলেও চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারেনি। অনেক প্রকল্পে নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে, আবার কোথাও কাজই শুরু হয়নি।
মিরপুরের সেনপাড়ায় অবস্থিত ডোম-ইনো প্রোভিস্তা প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। সেখানে গ্রাহকেরা ২০১২ সালে অর্থ পরিশোধ শুরু করেন এবং চুক্তি অনুযায়ী ২০১৫ সালে ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনো ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয়নি; শুধু কাঠামোগত কাজ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আবেদনকারীরা আরও অভিযোগ করেন, পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটি গ্রাহকদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করে। এর মধ্যে বড় অঙ্কের টাকা ‘বিলম্ব ফি’ হিসেবে দেখানো হয়। একটি ঘটনায়, এক গ্রাহক ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট বুকিং দিয়ে ৮০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। পরে কোম্পানিটি তার কাছে আরও ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দাবি করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ডোম-ইনো প্রমেসা প্রকল্পের পরিস্থিতিও বাসিন্দাদের জন্য মারাত্মক দুর্ভোগের সৃষ্টি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পটিতে তিনটি ভবনে মোট ১৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণের কথা ছিল। এর মধ্যে দুটি ভবন নির্মিত হলেও উল্লেখযোগ্য কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। আবেদনকারীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় কয়েকটি পরিবার প্রায় এক বছর ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে।
কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ২৪২ ধারা অনুযায়ী পাঠানো আইনি নোটিশের জবাব কোম্পানি না দেওয়ার পর বিষয়টি হাইকোর্টে গড়ায় বলে আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়। তাদের আইনজীবী এডভোকেট মোঃ নজরুল ইসলাম, এডভোকেট মোহাম্মদ জামিল খান এবং এডভোকেট মোঃ খলিল আদালতে যুক্তি দেন, কোম্পানির বর্তমান ব্যবস্থাপনার হাতে প্রকল্পের দায়িত্ব রাখা নিরাপদ নয়। তাই তিনি অস্থায়ী অবসায়ক নিয়োগের আবেদন করেন।
তবে ডোম-ইনোর আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, আইনগতভাবে এ মামলা হাইকোর্টে চলতে পারে না এবং এ ধরনের বিরোধ সালিশি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত কোম্পানির এ আপত্তি খারিজ করে অস্থায়ী অবসায়ক নিয়োগের নির্দেশ দেন।
সাধারণত একজন লিকুইডেটর বা অবসায়ক কোনো কোম্পানির সম্পদ ও কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ ব্যবস্থাপনা বা বিক্রি করে আইন অনুযায়ী কোম্পানির দায়-দেনা পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। ফলে আদালতের এই আদেশের পর সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি তদারকির আওতায় আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আবেদনকারীদের আইনজীবী জানান, শিগগিরই আদালতের আদেশের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা হবে। এরপর অস্থায়ী অবসায়ক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তিনি এই রায়কে আবাসন প্রতিষ্ঠান ও গ্রাহকদের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
আবেদনকারীদের দাবি অনুযায়ী, ডোম-ইনোর বিভিন্ন প্রকল্পে অন্তত ৮০ জন জমির মালিক এবং শত শত ফ্ল্যাট ক্রেতা একই ধরনের সমস্যার শিকার হয়েছেন। অনেক জমির মালিক নিজেদের বাড়ি ভেঙে জমি কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করার পরও বছরের পর বছর সম্পূর্ণ ভবন বুঝে পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
আবেদনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুস সালাম-এর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তাদের দাবি, তার বিরুদ্ধে অন্তত ১৩৬টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে কারাদণ্ড, আর্থিক জরিমানা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা-সংক্রান্ত মামলাও রয়েছে। ডোম-ইনো বিল্ডার্স ও ডোম-ইনো কনস্ট্রাকশন-এর বিরুদ্ধেও হাইকোর্টে পৃথক মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
হাইকোর্টের সর্বশেষ এই আদেশে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে থাকা ফ্ল্যাট ক্রেতা ও জমির মালিকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। তারা আশা করছেন, আদালতের তত্ত্বাবধানে প্রকল্পগুলোর দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনের পথ এবার উন্মুক্ত হবে।
