গণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মারুফ হাসান
প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
সোমবার ১০, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --
ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট
পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ, সবুজ বন আর পরিচিত জনপদ ছেড়ে তাঁরা এসেছেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে। কারও বাড়ি রাঙামাটি, কারও বান্দরবান, আবার কারও নেত্রকোনা। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন তাঁদের এক জায়গায় এনেছে। তবে ক্যাম্পাসে তাঁদের যাত্রা শুধু পাঠ্যসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া, নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখা এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলারও গল্প।
গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী তুশি চাকমা, ফার্মেসি বিভাগের অথৈ মৃ, বাংলা বিভাগের ছোমাউ মারমা এবং বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের নু মং উ মারমা—চারজনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও স্বতন্ত্র জাতিগোষ্ঠী থেকে এসেছেন। বিশ্ব আদিবাসী জনগোষ্ঠী দিবস উপলক্ষে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আনন্দ-বেদনা, চ্যালেঞ্জ, সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশার কথা।
পরিচিত জনপদ ছেড়ে নতুন জীবনের শুরু
নু মং উ মারমার বাড়ি রাঙামাটির পাহাড়ি এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথমবারের মতো তাঁকে দীর্ঘ সময় পরিবারের বাইরে থাকতে হচ্ছে। পরিচিত পাহাড়, আত্মীয়স্বজন ও নিজ সম্প্রদায়ের পরিবেশ ছেড়ে সমতলের ব্যস্ত জীবনে এসে শুরুতে নিজেকে খুব একা মনে হতো তাঁর।
নু মং বলেন, “বাড়িতে সবাইকে চিনতাম। নিজের ভাষায় কথা বলতে পারতাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে প্রথম কয়েক মাস সবকিছুই নতুন ছিল। তবে ধীরে ধীরে সহপাঠীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ায় পরিবেশটা সহজ হয়ে যায়।”
রাঙামাটি থেকে আসা তুশি চাকমার অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াকে তিনি জীবনের বড় অর্জন মনে করেন। তবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি যাওয়া এবং ছুটির সময় পরিবহনসংকট তাঁকে প্রায়ই ভোগায়।
অন্যদিকে বান্দরবান থেকে আসা বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ছোমাউ মারমা মনে করেন, পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখলেও তথ্যের অভাব, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ না থাকা এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পথ তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, “আমাদের এলাকার অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আছে। কিন্তু সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সঠিক নির্দেশনা পায় না। যারা সুযোগ পায়, তাদেরও নতুন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য অনেক চেষ্টা করতে হয়।”
নেত্রকোনা থেকে আসা অথৈ মৃ-ও পরিচিত পরিবার ও সামাজিক পরিবেশ ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন জীবন, নতুন মানুষ এবং ভিন্ন সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
ভাষা ও নতুন পরিবেশের চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর চার শিক্ষার্থীর অন্যতম বড় অভিজ্ঞতা ছিল ভাষাগত পরিবর্তন। নিজেদের পরিবার ও সম্প্রদায়ে তাঁরা মাতৃভাষায় কথা বললেও শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষা এবং দৈনন্দিন যোগাযোগে বাংলা ও ইংরেজির ওপর নির্ভর করতে হয়।
অথৈ মৃ বলেন, “বাংলা বুঝতে পারলেও শুরুতে সবার সামনে সাবলীলভাবে কথা বলতে সংকোচ হতো। ভুল উচ্চারণ নিয়ে কেউ হাসবে কি না, সেই ভয়ও কাজ করত। পরে বুঝেছি, নিয়মিত কথা বললেই আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।”
শুধু ভাষা নয়, খাবার, পোশাক, আবহাওয়া ও সামাজিক আচরণেও রয়েছে পার্থক্য। নতুন পরিবেশে এসে অনেক সময় তাঁদের সংস্কৃতি ও পরিচয় নিয়ে সহপাঠীদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কিছু প্রশ্ন আন্তরিক কৌতূহল থেকে এলেও, কখনো কখনো ভুল ধারণা বা অসংবেদনশীল মন্তব্য তাঁদের বিব্রত করে।
নু মং উ মারমা বলেন, “অনেকে আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চায়, এটা ভালো লাগে। কিন্তু কেউ যখন না জেনে মজা করে বা সবাইকে একই পরিচয়ে দেখে, তখন খারাপ লাগে। প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, পোশাক, উৎসব ও ঐতিহ্য রয়েছে।”
সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখার প্রয়াস
পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের সংস্কৃতি পরিচিত করে তুলতেও আগ্রহী এই শিক্ষার্থীরা।
নু মং উ মারমা বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার জায়গা। এখানে দেশের সব জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকা উচিত। এতে ভুল ধারণা কমবে এবং পারস্পরিক সম্মান বাড়বে।”
তাঁদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ থাকলেও তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি উপস্থাপনের আরও সুযোগ প্রয়োজন। একটি আদিবাসী শিক্ষার্থী সংগঠন বা সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম থাকলে নতুন শিক্ষার্থীদের মানিয়ে নেওয়াও সহজ হবে।
বৈষম্য নয়, প্রয়োজন সম্মান ও সহমর্মিতা
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে চার শিক্ষার্থীই বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার অনেক ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। অসুস্থতা, পড়াশোনা কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যায় সহপাঠীদের পাশে পেয়েছেন তাঁরা। তবে পরিচয় নিয়ে কৌতুক, ভুল নামে ডাকা কিংবা চেহারা ও ভাষা নিয়ে মন্তব্যের মতো অভিজ্ঞতাও তাঁদের হয়েছে।
নু মং উ মারমা বলেন, “সবাই যে খারাপ আচরণ করে, তা নয়। আমার অনেক ভালো বন্ধু আছে। তবে মাঝেমধ্যে এমন কিছু কথা শুনতে হয়, যেগুলো অন্যদের কাছে সাধারণ মনে হলেও আমাদের জন্য কষ্টদায়ক।”
তাঁদের মতে, বৈষম্য সব সময় প্রকাশ্য আক্রমণ হিসেবে আসে না; অনেক সময় না জেনে বলা কথা, প্রচলিত ধারণা কিংবা অসচেতন আচরণের মধ্যেও বৈষম্য লুকিয়ে থাকে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধ গড়ে তোলা জরুরি।
তুশি চাকমা বলেন, “আমরা আলাদা সংস্কৃতি থেকে এসেছি, কিন্তু আমরা সবাই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আমাদের পরিচয়কে সম্মান করে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
তাঁদের প্রত্যাশা, জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়; বরং যোগ্যতা, কাজ ও ব্যক্তিত্বের ভিত্তিতে যেন প্রত্যেককে মূল্যায়ন করা হয়।
সমান সুযোগ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্যাম্পাসের প্রত্যাশা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তাঁরা চান একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্যাম্পাস। দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন-সহায়তা, শিক্ষাবৃত্তি, জরুরি আর্থিক সহায়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
ছোমাউ মারমা বলেন, “নতুন পরিবেশে এসে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে একা হয়ে পড়ে। এমন একটি সহায়তা ব্যবস্থা থাকা দরকার, যেখানে তারা নির্ভয়ে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারবে।”
নু মং উ মারমা চান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু পাহাড়ি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য তথ্য ও পরামর্শসেবা চালু হোক। বর্তমান শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে উচ্চশিক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা ও বৃত্তি সম্পর্কে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।
অথৈ মৃর প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগার ও গবেষণায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আরও বই সংগ্রহ এবং গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
তুশি চাকমা বলেন, “আমরা শুধু নিজেদের জন্য সুযোগ চাই না। দেশের প্রত্যন্ত এলাকার যেসব শিক্ষার্থী এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার স্বপ্ন দেখছে, তাদের জন্যও পথটা সহজ হোক। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
বিশ্ব আদিবাসী জনগোষ্ঠী দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি বৈচিত্র্যকে সম্মান করা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা শোনা এবং সমঅধিকারের পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বানও বটে।
তুশি চাকমা, অথৈ মৃ, ছোমাউ মারমা ও নু মং উ মারমার গল্প সেই বাস্তবতাই তুলে ধরে। ভৌগোলিক দূরত্ব, ভাষাগত পার্থক্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পেরিয়ে তাঁরা এগিয়ে চলেছেন উচ্চশিক্ষার পথে। তাঁদের স্বপ্ন অন্য শিক্ষার্থীদের চেয়ে আলাদা নয়। তাঁরা পড়াশোনা শেষ করে পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করতে চান। আর সেই পথচলায় তাঁদের একটাই প্রত্যাশা, পরিচয়কে সম্মান করা হবে, সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে মর্যাদার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি হবে।