প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০২৬, ১১:১১ এএম
মুহাম্মাদ আল আমীন সাইফ
ঘণ্টা বাজছে বিদ্যালয়ে, শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করছে শ্রেণিকক্ষে। কিন্তু যিনি পাঠদান করবেন, তিনি তখন ব্যস্ত ভূমি অফিসে। কেউ জমির কাগজপত্র নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন, কেউ জমি মাপা, খাজনা-খারিজ কিংবা জরিপের কাজে সময় দিচ্ছেন। এমন চিত্রই উঠে এসেছে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে। এতে শুধু বিদ্যালয়ের পাঠদানই ব্যাহত হচ্ছে না, প্রশ্নের মুখে পড়ছে শিক্ষকতার মতো মহান পেশার দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যালয় চলাকালীন সময়েই ভূমি অফিসে যাতায়াত করেন কয়েকজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। অভিযোগ রয়েছে, তারা ব্যক্তিগত প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে জমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন পেশাগত কাজে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
গত ১৩ জুলাই দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দেখা যায় ১৪০ নম্বর চরকুমিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জাহিদুল ইসলামকে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি খণ্ডকালীন সার্ভেয়ার (আমিন) হিসেবে কাজ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি মানুষের জমি মাপা, খাজনা-খারিজ, নামজারি ও অন্যান্য ভূমি-সংক্রান্ত কাজ করে থাকেন। ভূমি অফিসে উপস্থিত থাকার কারণ জানতে চাইলে জাহিদুল ইসলাম স্বীকার করেন, তিনি একজন গ্রাহকের প্রয়োজনে সেখানে এসেছেন। তবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারজানা আক্তার জানান, ওই দিন বিদ্যালয় ত্যাগের জন্য তিনি কোনো অনুমতি নেননি। তিনি আরও বলেন, জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আগেও পেশাগত অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে ১০২ নম্বর রামপুর বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধেও। রবিবার ১৯ জুলাই দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে তাকে উপজেলা ভূমি অফিসে দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, তিনি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে ভূমি অফিসে যাতায়াত করেন।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদা পারভীন জানান, রেজাউল করিমকে শুধু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ভূমি অফিসে যাওয়ার জন্য কোনো অনুমতি বা নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক রেজাউল করিম বলেন, আমি এমনিতেই সেখানে গিয়েছি কোন নির্দিষ্ট কারন ছাড়াই।
তবে উপজেলা ভূমি অফিসের অফিস সহকারী মাসুম আলম ভিন্ন তথ্য দেন। তিনি জানান, রেজাউল করিম এর কিছুদিন পূর্বেই দুপুর নাগাদ খতিয়ানের নাম সংশোধনের কাজে ভূমি অফিসে এসেছেন এবং আজও একই বিষয়ে অফিসে এসেছিলেন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে অন্য পেশায় সময় ব্যয় করেন, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। প্রাথমিক স্তরে প্রতিটি ক্লাসই শিশুর মানসিক ও শিক্ষাগত বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে শিক্ষকের অনুপস্থিতি শিক্ষার ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ ও শৃঙ্খলা বিধিমালা অনুযায়ী, বিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকা প্রত্যেক শিক্ষকের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনায়ও বিদ্যালয়ের সময় অন্য কোনো লাভজনক পেশায় সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ড গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শিরিন শারমিন বলেন, “সহকারী শিক্ষক জাহিদুল ইসলামকে ইতোমধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। রেজাউল করিমের বিষয়টিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, যাঁরা জাতি গঠনের কারিগর হিসেবে পরিচিত, তাঁরা যদি শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে ভূমি অফিসে সময় কাটান, তাহলে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবেন কে?
শিক্ষাবিদদের মতে, বিচ্ছিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর জবাবদিহিতা এবং কার্যকর প্রশাসনিক নজরদারি। অন্যথায় এমন অনিয়ম ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে, যার মূল্য দিতে হবে কোমলমতি শিক্ষার্থী এবং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে।
শিক্ষকতার মর্যাদা রক্ষায় এখন সবচেয়ে জরুরি হলো অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা। কারণ একজন শিক্ষকের অনুপস্থিতি শুধু একটি ক্লাসকেই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত করে একটি প্রজন্মের শিক্ষাজীবন।
