প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩০ পিএম
পাবনা শহরের একটি ছাত্রী নিবাস থেকে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ইতিহাস বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের (১৭তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী রাজমনি ইসলামের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ স্থানীয় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পাবনা শহরের ডিগ্রি বটতলা এলাকার বাদশা ছাত্রী নিবাসের একটি কক্ষ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি পাবনা জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
নিহত রাজমনি ইসলাম ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ গ্রামের বাসিন্দা মো. আকালু ইসলামের মেয়ে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে ওই ছাত্রী নিবাসেই বসবাস করতেন।
পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতেন রাজমনি। সেই লক্ষ্যে আইইএলটিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য একটি কোর্সে ভর্তি হতে প্রায় ৪০ হাজার টাকার প্রয়োজন ছিল। তবে পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে সেই অর্থের ব্যবস্থা সম্ভব হয়নি। স্বজনদের দাবি, এ বিষয়টি নিয়ে তিনি বেশ কিছুদিন ধরে মানসিক চাপে ছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, রাজমনির জন্মের পর ২০০৫ সালে তার বাবা একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং এখনও কারাগারে রয়েছেন। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। বড় বোন একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত এবং ভাই পেশায় গাড়িচালক। নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তিনি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
মেয়ের অভিভাবক চাচা জানান, সে প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাননি। দ্বিতীয়বারে সে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়। কিন্তু তার ভর্তি হওয়া বিষয়টি পছন্দ ছিল না সে আইইএলটিএস করার জন্য পরিবারকে জানায় এবং তাদের কাছে ৪০ হাজার টাকা চেয়ে বসেন। সে আইইএলটিএস করে বিদেশে গিয়ে পড়ালেখা করবে। তাকে সান্তনা দিয়ে বলেন আপাতত যেখানে আছো এটা ভালোভাবে পড়ো। সে জানায় তাহলে আমি কিসের লেখা পড়া করবো? আমরা বলি দেখা যাক কি করতে পারি। পরিবারের টানাপোড়নে সেই টাকাটি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
তিনি আরো বলেন, মৃত্যুর দিন দুপুর ১২ টার আগে তার সাথে পরিবারের কথা হয় এবং পরবর্তীতে আমরা তার বন্ধু প্রান্ত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও প্রত্ত্বতত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী তাকে বিষয়টি জানাই যে দেখতো সে ফোন ধরছে না কেন।
রাজমনির বন্ধু প্রান্ত দেবনাথ বলেন, “সে তার পরিবার নিয়ে হতাশায় ছিল। দুপুরে আমাদের কথা হয় তখন সে পরিবার নিয়ে কথা বলে তখন বুঝতে পারলাম সে হতাশায় ভুগছিলেন। পরে ফোন দিলাম ফোন ধরতে ছিলো না এইজন্য তার পাশের জনকে ফোন দিয়েছিলাম।”
রুমমেট অর্পিতা রশিদ বলেন, “প্রান্ত ফোন দিয়ে বলেন, তোমার বান্ধবী অস্বাভাবিক আচরণ করছে। একটু দেখে এসো। ফোন দিচ্ছি, ধরছে না। এরপর মেসে ফোন দেওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। আমি দ্রুত সেখানে যাই। গিয়ে দেখি, কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পাই।”
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করেছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. রাশেদুল হক।
তিনি বলেন, “এভাবে একজন শিক্ষার্থীকে হারানো অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার গভীরভাবে মর্মাহত। শিক্ষার্থীর অভিভাবকেরা এসেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে যতটুকু সম্ভব, আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করেছি।”
এ বিষয়ে পাবনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, “আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা করা হয়নি।”
