প্রকাশিত: ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, মাঝে মাঝে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে দেশ-জাতির দুঃসময়ে কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়িয়ে অন্যায়কে পৃষ্ঠ করে যখন বিজয় কেতন উড়ায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংজ্ঞাকেও ছাড়িয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়; রূপ নেয় অধিকার আদায় এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ না করা এক পীঠস্থান রূপে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) হলো সেই পীঠস্থান, ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর এই অঞ্চলে নিপীড়িত মানুষের পাশে থেকেছে, ছিনিয়ে এনেছে অধিকার, সৃষ্টি করেছে নতুন ইতিহাস, বিশ্ব মানচিত্রের বুকে বাংলাদেশ নামক দেশ সৃষ্টিতে যার অবদান কোন অংশে কম নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সম্মুখ থেকে দেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে নেতৃত্ব দিয়ে পাশে থেকেছে। গৌরব সংগ্রামের ১০৪ পেরিয়ে ১০৫ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গৌরবগাঁথা ১০৪ বছরে এই বিদ্যাপিঠের প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস।
পৃথিবীর হয়তো অনেক নামী বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে, তবে রাষ্ট্র সৃষ্টি এবং রক্ষায় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। জানা যায়, ১৮৪৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে মুসলিম শিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলার একধরনের নবজাগরণ তৈরি হয়। যার প্রভাব পড়ে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গতেও। বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন তৎকালীন ব্রিটশ ভারতের ভাইস রয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। এরপর পূর্ব ভাইস রয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেদন জানান ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, ধনবাড়ীর নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ বাংলার অন্য নেতারা।
২৭ মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ব্যারিস্টার আর নাথানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। ১৯১৩ সালে প্রকাশিত হয় নাথান কমিটির ইতিবাচক রিপোর্ট, ওই বছরের ডিসেম্বরে সেটি অনুমোদিত হয়। এদিকে ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এর ফলে পূর্ব বাংলার মানুষ হতাশা প্রকাশ করে। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী সরকারের কাছে অবিলম্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পেশের আহ্বান জানান। পরবর্তীতে ওই বছরে গঠিত স্যাডলার কমিশনও ইতিবাচক প্রস্তাব দিলে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইনসভা পাশ করে ‘দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট (অ্যাক্ট নং-১৩) ১৯২০’। সবশেষে ১৯২১ সালের পহেলা জুলাই পূর্ব বঙ্গের বুকে উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়। সেই সময়কার ঢাকার অভিজাত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত রমনা এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর পূর্ববঙ্গ এবং আসাম প্রদেশ সরকারের পরিত্যক্ত ভবনগুলো এবং ঢাকা কলেজের (বর্তমান কার্জন হল) ভবনগুলোর সমন্বয়ে মনোরম পরিবেশ গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার এই দিনটি প্রতিবছর ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
প্রতিষ্ঠাকালীন তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু হয়। প্রথম শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন বিভাগে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৮৭৭ জন এবং শিক্ষক সংখ্যা ছিল ৬০ জন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদ, ১৩টি ইনস্টিটিউট, ৮৪টি বিভাগ, ৬০টি ব্যুরো ও গবেষণা কেন্দ্র এবং ছাত্রছাত্রীদের ১৯টি আবাসিক হল, ৪টি হোস্টেল ও ১৩৮টি উপাদানকল্প কলেজ ও ইনস্টিটিউট রয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৪৬ হাজার ১৫০ জন। পাঠদান ও গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৮ শিক্ষক।
১০৬তম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপনে এ বছর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।’ দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে আজ বুধবার (১ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল হল ও হোস্টেল থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ শোভাযাত্রা সহকারে স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে সমবেত হবেন। সেখান থেকে সকাল পৌনে দশটায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হবে। শোভাযাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অ্যালামনাই, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ অংশ নিবেন। সকাল ১০টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সম্মুখস্থ চত্বরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলসমূহের পতাকা উত্তোলন এবং কেক কাটা হবে। এসময় সংগীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে জাতীয় সংগীত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের থিম সং এবং রবীন্দ্র সংগীত ও নজরুল সংগীত পরিবেশিত হবে। এছাড়া, বিদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অন্য একটি সংগীত পরিবেশিত হবে।
সকাল সাড়ে ১০টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও উচ্চশিক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ক্লাসসমূহ বন্ধ থাকবে, তবে পরীক্ষাসমূহ যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষ্যে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে এই দিন বিকাল ৩টায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলানায়তনে এক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এবং উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ প্যানেল আলোচক হিসাবে বক্তব্য রাখবেন।
উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষ্যে সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে আজ বুধবার বেলা আড়াইটাটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যানবাহন প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। উল্লেখিত সময়ে শাহবাগ, দোয়েল চত্বর, শিববাড়ি ক্রসিং, ফুলার রোড ও নীলক্ষেত প্রবেশপথে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টিকারযুক্ত গাড়ী এবং জরুরি সেবা (অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার, রোগী, সাংবাদিক, রাইড শেয়ার, খাবার গাড়ী, অনলাইন শপিং বাহনসহ অন্যান্য সরকারি গাড়ী) ব্যতীত অন্য যানবাহন ক্যাম্পাসের ভিতরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকবে। পলাশী থেকে দোয়েল চত্বর হয়ে হাইকোর্ট মোড়ের রাস্তা উন্মুক্ত থাকবে। তবে গণপরিবহণ এবং ভারী যানবাহন প্রবেশ সবসময়ই নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
