প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২৬, ০৬:৩৫ পিএম
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য নিয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিক্ষা খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এবারের বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে আমরা জাতীয় অগ্রযাত্রার “নিউক্লিয়াস” (মূল কেন্দ্র) হিসেবে বিবেচনা করেছি। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতার দ্বারা। তাই বর্তমান সরকার শিক্ষাকে কেবল সনদ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়; বরং জাতীয় পুনর্গঠন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।’
শিক্ষাক্রমে আসছে তৃতীয় ভাষা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শিক্ষাক্রমকে এমনভাবে রূপান্তর করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ, নেতৃত্বের গুণাবলি ও মানবিক চরিত্রের বিকাশ ঘটে।
তিনি জানান, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি জাপানিজ, কোরিয়ান, মান্ডারিন, আরবি, ফ্রেঞ্চ ও জার্মানসহ বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া তৃতীয় ভাষা শিক্ষার জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের ১০ লাখ টাকা ঋণ সুবিধাও অব্যাহত থাকবে।
মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বদলে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা
বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, অনুধাবন, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগভিত্তিক শিক্ষাকে উৎসাহিত করা হবে। বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্যচর্চার মতো ক্লাবভিত্তিক সহশিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষার্থীর অন্তত একটি খেলাধুলায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হবে। স্কাউটস, বিএনসিসি ও গার্লস গাইডসের কার্যক্রমও আরও বিস্তৃত করা হবে।
ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশকে একটি দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা চালু করা হবে।’
এর আওতায় কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিকস, গ্রাফিক ডিজাইন, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ ও সৃজনশীল শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
মেয়েদের স্নাতক পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষা
বাজেটে মেয়েদের জন্য বিনা মূল্যে স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষা সম্প্রসারণ, পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ‘মিড ডে মিল’ চালু, ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং স্যানিটেশন ও হাইজিন ব্যবস্থার উন্নয়নের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য স্বতন্ত্র আইডি, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং এআই, রোবোটিকস, কোডিং ও ডিজিটাল লিটারেসি শিক্ষার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ ও আন্তর্জাতিক সংযোগ
পরিবেশ ও নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, জলবায়ু সচেতনতা শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্তকরণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া ‘ব্রেইন ড্রেইন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তরের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানের ক্রেডিট ট্রান্সফার ব্যবস্থা, স্টুডেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম, সামার স্কুল, ভিজিটিং স্কলার উদ্যোগ ও যৌথ গবেষণা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতার শেষাংশে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা এমন আগামীর প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, যারা কেবল নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়বে না, বরং সমাজ ও দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করবে। যারা কেবল সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে না, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে; যারা সময়ের অনুসারী নয়, বরং পরিবর্তনের নেতৃত্বে দেবে।’
