প্রকাশিত: ০৭ জুন ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তি নির্ভর এবং বাস্তব ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।তিনি বলেন, ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রচলিত শিক্ষা কারিকুলামকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করার কোনো বিকল্প নেই।'
তিনি আজ রোববার সকালে বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত 'কর্মমুখী ও টেকনিক্যাল শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ শুধুমাত্র দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকারই কেড়ে নেয়নি কিংবা দেশের সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকেই অকার্যকর করে দেয়নি, শিক্ষা ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।'
একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, 'দেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ অর্জন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে যেসব সাহসী মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের অবদানকে সম্মান জানাতে আমাদের শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। অন্যথায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কষ্টকর হবে।'
উচ্চশিক্ষা বিস্তারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'সারাদেশে ২ হাজারের বেশি অধিভুক্ত কলেজে বর্তমানে ৪০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনার সংকট নিরসন এবং সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেশের আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষা বিস্তারে এই প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।'
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, 'অটোমেশন এবং এআই-চালিত প্রযুক্তির কারণে অনেক পুরোনো পেশা ঝুঁকির মুখে পড়লেও নতুন অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব মোকাবিলায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সিকিউরিটি, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল এন্টারপ্রেনারশিপ, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ন্যানো টেকনোলজি এবং ফাইভ জি প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলো শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষাক্রমকে বাস্তবভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার কাজ শুরু করেছে।'
প্রধানমন্ত্রী উচ্চশিক্ষিত পর্যায়ে বেকারত্বের হার কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, 'সর্বোচ্চ একাডেমিক সার্টিফিকেট অর্জন করলেও প্রায়োগিক দক্ষতার অভাবে অনেকেই বেকার থাকছেন। এই পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার এপ্রেন্টিসশীপ, ইন্টার্নশীপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোতে এই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মদক্ষতা অর্জন করতে পারেন।'
তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, 'ক্যাম্পাস থেকেই ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা তৈরি করতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ইনোভেটিভ বিজনেস আইডিয়া' বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় 'সিড ফান্ডিং' বা 'ইনোভেশন গ্র্যান্ট' প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে তরুণরা চাকুরির পেছনে না ছুটে নিজেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে।'
প্রযুক্তির পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একজন মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার জন্য নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই। দক্ষতা ও মডার্নাইজেশনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে আরও যত্নশীল হতে হবে।’
এ ছাড়া বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় আরেকটি ভাষা শিখতে পারলে দেশে-বিদেশে চাকুরির অভাব হবে না বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শিক্ষকদের সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত ও রোল মডেল হিসেবে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'দেশের ছাত্র ও যুবশক্তিকে প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল হবে।'
জাতীয় উন্নয়নকে একটি সম্মিলিত যাত্রা হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নাগরিক সমাজ এবং শিল্পখাতসহ সকলের ঐক্যবদ্ধ সহযোগিতা কামনা করেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ’র সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান বক্তব্য রাখেন।
