প্রকাশিত: ২০ মে ২০২৬, ০১:০০ এএম
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার এন্ট্রি ফর্ম পূরণে এখনো প্রচলিত ম্যানুয়াল পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডিজিটাল যুগে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন সেবা নিশ্চিত করলেও, বুটেক্সে এখনো হাতে লিখে ফর্ম পূরণ করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, সেমিস্টার শেষে একসঙ্গে ল্যাব ফাইনাল, ক্লাস টেস্ট এবং ফর্ম ফিল-আপের চাপ তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে ওঠে। স্বল্প সময়ের নোটিশে ফি প্রদান, সমন্বয়হীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল সেবার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার একটি অটোমেশন প্রকল্প চলমান রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় অনলাইন ফর্ম ফিল-আপ সেবা এখনো চালু হয়নি। ফলে একই সময়ে একাধিক ব্যাচের ফর্ম পূরণের কারণে ক্যাম্পাস ও আশপাশের স্টেশনারি দোকানগুলোতে দীর্ঘ ভিড় তৈরি হয়, যা শিক্ষার্থীদের সময় ও মানসিক চাপ দুই-ই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এছাড়া অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের হল ক্লিয়ারেন্সের জন্য প্রতিটি হলে আলাদাভাবে যেতে হওয়ায় প্রশাসনিক জটিলতা আরও বেড়ে যায়।
৪৮তম ব্যাচের ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী শোয়েব আল জান্নাত বলেন, “বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা, অদূরদর্শিতা এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে অনীহার কারণে বুটেক্স দীর্ঘদিন ধরে অটোমেশন প্রকল্প বাস্তবায়নহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অটোমেশন ব্যবস্থা না থাকায় ফর্ম ফিলাপ, হল ও লাইব্রেরি ক্লিয়ারেন্স এবং হাতে লিখে ফরম পূরণের মতো কাজে শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে সেমিস্টারের শেষ সময়ে সিটি, ল্যাব ভাইভা ও ফরম ফিলাপ একসঙ্গে পড়লে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। আমি দ্রুত সময়ে অটোমেশন প্রকল্প চালু করে শিক্ষার্থীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনকে আহ্বান জানাই।”
এই ভোগান্তির মধ্যেই আশার আলো হয়ে এসেছে এক শিক্ষার্থীর উদ্ভাবন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৯তম ব্যাচের ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী তারেক আল ইমরান নিজ উদ্যোগে একটি স্বয়ংক্রিয় ফর্ম পূরণ সিস্টেম তৈরি করেছেন, যা ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
তার তৈরি সিস্টেমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে সহজেই টার্ম ফাইনাল পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করতে পারছেন। সাবমিশনের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবেদনপত্র ও প্রবেশপত্র তৈরি হচ্ছে, ফলে সময় ও ঝামেলা দুটোই কমে আসছে।
তারেক আল ইমরান বলেন, “প্রথম বর্ষের লেভেল-১ টার্ম-১ পরীক্ষার সময় ফরম পূরণ সিস্টেম দেখে সত্যিই অনেক হতাশ হয়েছিলাম। তখন থেকেই মনে হতো অন্তত ফরম পূরণ পদ্ধতিটা যদি অটোমেটেড হতো, তাহলে শিক্ষার্থীদের অনেক ভোগান্তি কমত।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে বিশ্ব যেখানে এআই নিয়ে ভাবছে, সেখানে বুটেক্স এখনো অ্যানালগ সিস্টেমে পড়ে আছে। পরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন CS50x কোর্স করার সময় একটি প্রজেক্টের অংশ হিসেবে এই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করি।”
তারেকের তৈরি এই সিস্টেমটি পাইথন, ফ্লাস্ক, এইচটিএমএল-সিএসএস এবং পিডিএফ পার্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। তথ্য নিরাপত্তার কারণে এতে কোনো ডাটাবেজ সংযুক্ত করা হয়নি।
তিনি জানান, এটি এখনো পূর্ণাঙ্গ সফটওয়্যার নয়, বরং একটি ডেমো ও হবি প্রজেক্ট। ভবিষ্যতে আরও উন্নত সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
তার উদ্ভাবিত সিস্টেম ব্যবহার করে উপকৃত হয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী। অ্যাপারেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী অভিষেক চন্দ্র শ্রাবণ বলেন, “আগে ফরমে ভুল হলে কাটাকাটি করতে হতো কিংবা নতুন করে ফরম পূরণ করতে হতো। এখন সেটা লাগছে না। পুরো প্রক্রিয়াটাই অনেক দ্রুত ও সহজ হয়েছে।”
শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, প্রশাসনিক উদ্যোগের অভাবে এখন শিক্ষার্থীদেরই নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে হচ্ছে। ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন থাকলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্য এখনো অনেক দূরে।
