প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৩৭ এএম
পহেলা বৈশাখ শুধু নববর্ষের সূচনা নয়, এটি বাঙালির আত্মার পুনর্জন্মের এক অনন্য ক্ষণ।এটি বাঙালির প্রাণের মেলা, যেখানে মিলনের সুরে বিলীন হয়ে যায় সকল জরা আর গ্লানি।ক্লাস, পরীক্ষা,এসাইনমেন্টের ব্যস্ততার মাঝে ক্যাম্পাসে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের গল্প নিয়ে ফিচারটি লিখেছেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নায়িমা আখতার।
হারিয়ে যাওয়া স্বাদের ইতিহাস
পহেলা বৈশাখ এলেই আমাদের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে পান্তা-ইলিশের ছবি, কিন্তু বাঙালির শতবর্ষের ঐতিহ্যে এই একটি খাবারই সবকিছু ছিল না; বরং এর বাইরেও ছিল বৈচিত্র্যময় এক সমৃদ্ধ খাদ্যসংস্কৃতি, যা আজ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রামবাংলায় নববর্ষ মানে ছিল নতুন বছরের সূচনা, জমির হিসাব-নিকাশ, আর ঘরে তৈরি সহজ অথচ তৃপ্তিদায়ক খাবারের আয়োজন। তখন পান্তা ভাত থাকলেও ইলিশ ছিল না এতটা অপরিহার্য বরং শুটকি ভর্তা, আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, ডাল, কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজ দিয়েই সাজানো হতো বৈশাখের খাবার। সকালের আপ্যায়নে চিঁড়া, মুড়ি, নারকেল আর খেজুরের গুড়ের সঙ্গে কলা বা দই ছিল খুবই জনপ্রিয়, যা অতিথিপরায়ণতার এক সহজ অথচ আন্তরিক প্রকাশ ছিল। অনেক অঞ্চলে পিঠা-পায়েসের আয়োজনও দেখা যেত, বিশেষ করে নারকেলের পুলি বা চালের গুঁড়োর তৈরি নানা পিঠা, যা উৎসবের স্বাদকে আরও গভীর করত। পাশাপাশি মৌসুমি ফল যেমন আম, কাঁঠাল বা লিচুও বৈশাখের খাবারের অংশ হয়ে উঠত, যা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে দৃঢ় করত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সব খাবার ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে; শহুরে জীবনের ব্যস্ততা, ফাস্টফুডের প্রতি আকর্ষণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শননির্ভর সংস্কৃতি এসব ঐতিহ্যকে আড়াল করে ফেলছে। এখন অনেকের কাছেই পান্তা-ইলিশ একটি ট্রেন্ড, বিশেষ করে Facebook বা Instagram-এ ছবি শেয়ার করার জন্য এই আয়োজন বেশি গুরুত্ব পায়, অথচ এর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে গ্রামীণ জীবনের সরলতা ও স্বাদ। তবুও কিছু সাংস্কৃতিক উদ্যোগ, গ্রামীণ মেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়োজনের মাধ্যমে এই হারিয়ে যাওয়া খাবারগুলোকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, যা নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত করতে সাহায্য করছে। পহেলা বৈশাখ শুধু উৎসব নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক; তাই পান্তা-ইলিশের বাইরেও যে বিস্তৃত খাদ্যসংস্কৃতি রয়েছে, তা সংরক্ষণ ও পুনরুজ্জীবন করা জরুরি, কারণ এই স্বাদগুলোতেই লুকিয়ে আছে বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনবোধের গভীরতম প্রকাশ।
সাদিয়া সুলতানা রিমি
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ ,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
শেকড়ে ফেরা এক মহাকাব্য পহেলা বৈশাখ
পহেলা বৈশাখ বাঙালির আত্মার মহাকাব্যিক জাগরণ, সময়ের নির্দয় স্রোত ভেদ করে উঠে আসা এক চিরন্তন পুনর্জন্মের উচ্চারণ, যেখানে প্রতিটি সূর্যোদয় যেন ইতিহাসের গভীর অন্ধকার ভেঙে আলোয় ভরা এক নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করে। এই দিন শুধুই বর্ষপঞ্জির পরিবর্তন নয়, এটি শিকড়ে ফেরার এক আবেগময় অভিযাত্রা, যেখানে মাটির গন্ধে লুকিয়ে থাকে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, সংগ্রাম আর স্বপ্নের অপার বিস্তার। বৈশাখের প্রতিটি হাওয়া বয়ে আনে প্রেরণার উন্মত্ততা, ভাঙনের বুক চিরে উঠে দাঁড়ানোর দুর্বার সাহস, আর হৃদয়ের গহীনে জ্বালিয়ে দেয় অদম্য আশার দীপশিখা।
এই উৎসব আমাদের সংস্কৃতির দীপ্ত প্রতিচ্ছবি, যেখানে রঙিন আলপনা, বর্ণিল মেলা আর প্রাণের উচ্ছ্বাস মিলেমিশে তৈরি করে এক অমলিন ঐক্যের প্রতিমা, যা ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে মানুষ হওয়ার মন্ত্র শেখায়। পহেলা বৈশাখ তাই শুধু উৎসব নয়, এটি আত্মপরিচয়ের গভীর ঘোষণা, ভালোবাসা আর সম্ভাবনার এক অনন্ত আকাশ, যেখানে প্রতিটি প্রাণ নতুন করে বাঁচার সাহস খুঁজে পায়।
জান্নাতি খাতুন
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ,গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
পহেলা বৈশাখ: ঐতিহ্য নয়, লৌকিকতার এক প্রদর্শনী
ভোরের প্রথম আলো যখন শহরের কংক্রিটের দেয়াল ছুঁয়ে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখনও কোথাও লুকিয়ে থাকে এক অন্য বৈশাখ- মাটির গন্ধমাখা, মানুষের সহজ-সরল আনন্দে নির্মিত। একসময় পান্তা-ইলিশ, হালখাতার নতুন সূচনা, কিংবা গ্রামীণ মেলার প্রাণচাঞ্চল্যে বৈশাখ ছিল জীবনেরই অংশ; অনুভবের, স্পর্শের, অংশগ্রহণের। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই বৈশাখ ক্রমেই রূপ নিচ্ছে এক পরিকল্পিত আয়োজনের, যেখানে ঐতিহ্যের চেয়ে প্রদর্শনই হয়ে উঠেছে মুখ্য।
এককালে বৈশাখ ছিল মানুষের উৎসব, বাজারের নয়। গ্রামের মেলায় মাটির পুতুল, বাঁশের বাঁশি কিংবা পাটের দড়ি শুধু পণ্য নয়-ছিলো জীবনের গল্প, সংস্কৃতির ধারক। সেখানে কোনো ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল না বাহুল্য; ছিল মানুষের আন্তরিক উপস্থিতি। অথচ আজকের শহুরে বৈশাখ এক করপোরেট কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ। নির্দিষ্ট রঙের পোশাক, ব্র্যান্ডনির্ভর খাবার, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখুঁত উপস্থিতি- এসবই যেন উৎসবের নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করছে। ফলে বৈশাখ এখন আর অন্তরের অনুভব নয়, বরং এক দৃশ্যমান প্রদর্শনী।
এই রূপান্তর শুধু সাংস্কৃতিক বিচ্যুতি নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও গভীর উদ্বেগের। উৎসব শেষে রাস্তাজুড়ে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য আমাদের উদযাপনের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। একদিনের আনন্দের বিনিময়ে আমরা প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে দিচ্ছি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি-যার হিসাব আমরা রাখি না, কিংবা রাখতে চাই না।
এর চেয়েও গভীর সংকট তৈরি হয়েছে আমাদের মনস্তত্ত্বে। আমরা এখন বৈশাখকে অনুভব করার চেয়ে বেশি ব্যস্ত তাকে প্রদর্শন করতে। লোকসংগীতের আবেগ হারিয়ে যাচ্ছে উচ্চকিত যান্ত্রিক সুরে, মৃৎশিল্পীদের শিল্প বিলীন হচ্ছে প্লাস্টিকের সহজলভ্য বিকল্পে, আর মানুষ ভিড়ের মধ্যেও হয়ে উঠছে একা- শুধুমাত্র স্ক্রিনে আবদ্ধ। উৎসব যেখানে সংযোগ তৈরি করার কথা, সেখানে তৈরি হচ্ছে বিচ্ছিন্নতা।
তবুও আশার জায়গা রয়ে গেছে। বৈশাখ কোনো বাহ্যিক উপকরণ নয়; এটি একটি চেতনা, যা এখনো আমাদের ভেতরে জীবিত। প্রয়োজন কেবল সেই চেতনাকে পুনরুদ্ধার করা। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, স্থানীয় কারিগরদের পণ্যকে প্রাধান্য দেওয়া এবং উৎসবকে সরলতায় ফিরিয়ে আনা- এসব ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
অবশেষে প্রশ্ন রয়ে যায়- আমরা কি সত্যিই বৈশাখকে বাঁচিয়ে রাখছি, নাকি কেবল তার বাহ্যিক আবরণ আঁকড়ে ধরে আছি? কারণ যে বৈশাখে মানুষ হারিয়ে যায়, আর থাকে শুধু আয়োজন- সেই বৈশাখ নিঃশব্দ শূন্যতার প্রতীক। সত্যিকারের বৈশাখ ফিরে আসবে তখনই, যখন আমরা প্রদর্শন ছেড়ে অনুভবে ফিরব; কৃত্রিমতার আড়াল সরিয়ে মাটির কাছে ফিরে যাব। তবেই ‘এসো হে বৈশাখ’ আহ্বানটি হয়ে উঠবে সত্যিকার অর্থেই প্রাণবন্ত ও অর্থবহ।
নাইমা সুলতানা
পরিবেশ বিজ্ঞান ও দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ,গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
জীবনকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ
পহেলা বৈশাখ আমার কাছে শুধু একটি উৎসব নয়, বরং সময়ের সাথে বদলে যাওয়া অনুভূতির এক নীরব গল্প। ছোটবেলায় বৈশাখ মানেই ছিল আনন্দের সরলতা নতুন জামা, ভোরবেলার উত্তেজনা, মায়ের হাতের পান্তা-ইলিশের গন্ধে ভরে থাকা ঘর আর বাবার হাত ধরে বৈশাখী মেলায় ঘুরতে যাওয়া। তখন বৈশাখের মানে ছিল শুধু খুশি, কোনো দায়িত্ব ছিল না, ছিল না জীবনের জটিলতা।
কিন্তু এখন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে দাঁড়িয়ে বৈশাখের অনুভূতিটা অন্যরকম। আগের মতো সেই নির্ভেজাল উচ্ছ্বাস নেই, কিন্তু আছে এক ধরনের গভীরতা। এখন বুঝতে পারি এই দিনটা শুধু উৎসব নয়, বরং নিজের শিকড়ের সাথে পুনরায় সংযোগের একটি উপলক্ষ। ব্যস্ত ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মাঝেও পহেলা বৈশাখ এসে যেন একটু থামতে শেখায়।
ছোটবেলায় বৈশাখ ছিল পরিবারকেন্দ্রিক সবার সাথে বসে খাওয়া, আত্মীয়দের বাসায় যাওয়া, টেলিভিশনে বৈশাখী অনুষ্ঠান দেখা। আর এখন বৈশাখ মানে বন্ধুদের সাথে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ানো, লাল-সাদা পোশাকে ছবি তোলা, কিংবা কখনো একা বসে পুরোনো দিনের কথা ভাবা। এই পরিবর্তনটা কখন যে হয়ে গেল, তা টেরই পাইনি।
তবে একটা জিনিস আজও একই রয়ে গেছে এই দিনের বিশেষ অনুভূতি। বৈশাখ এলেই মনে হয়, জীবনটা নতুন করে সাজানোর সুযোগ এসেছে। গত বছরের ভুলগুলোকে পেছনে ফেলে, নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস পাই। হয়তো এখন আর ছোটবেলার মতো নির্ভাবনা নেই, কিন্তু আছে নিজেকে নতুন করে গড়ার দৃঢ়তা।
সাদিয়া সুলতানা রিয়া
আইন বিভাগ,গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
পহেলা বৈশাখ আসে নতুনের বার্তা নিয়ে
“ভস্ম হতে জেগে ওঠা ফিনিক্সের মতো, পহেলা বৈশাখ হলো বাঙালির সেই অবিনাশী স্পর্ধা যা জীর্ণতাকে পুড়িয়ে ছাই করে নতুনের বিজয়তিলক পরে ফিরে আসে।”তপ্ত রোদে যখন দুপুরের আকাশ তামাটে হয়ে ওঠে, আর ধুলোবালির মিছিলে আকাশ কাঁপে কালবৈশাখীর গর্জনে, ঠিক তখনই বাংলার হৃদপিণ্ডে বেজে ওঠে পুনর্জন্মের দামামা। কালবৈশাখীর রুদ্রমূর্তিতে ধুয়ে মুছে গেছে জীর্ণতা, আর সেই নতুনের বার্তা নিয়ে বাঙালির জীবনে ফিরে এসেছে পহেলা বৈশাখ।
এটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা বদল নয়, বরং হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্যের এক মহা-উন্মেষ। বাংলার আকাশে যখন বৈশাখী রোদ খেলা করে, তখন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বেজে ওঠে নতুনের জয়গান। এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এক অসাম্প্রদায়িক ও উদার সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। ভোরের প্রথম আলো যখন প্রকৃতিকে স্পর্শ করে, তখন রমনার বটমূল থেকে শুরু করে সারা দেশের অলিগলিতে ধ্বনিত হয় ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। এই সুর বাঙালির আত্মার আকুতি, যা সমস্ত গ্লানি দূর করে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখায়।
শহরের কৃত্রিম আলো আর শপিং মলের চাকচিক্যকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আজ রাজত্ব করে মেঠো সুর আর মাটির ঘ্রাণ। মেলায় নাগরদোলনার শব্দ যেন কোনো এক দূর অতীতে নিয়ে যায়, যেখানে বাতাসা আর কদমার স্বাদে লেগে থাকতো মাটির সোঁদা গন্ধ। বৈশাখ আমাদের শেখায় আভিজাত্য কেবল দামী পোশাকে নয়, বরং সাদা সুতি শাড়ির লাল পাড় আর কপালে আঁকা ছোট্ট টিপেই তা লুকিয়ে আছে। এটি এমন এক সময়, যখন আধুনিকতা আর ঐতিহ্য হাত ধরাধরি করে হাঁটে। এক হাতে স্মার্টফোন আর অন্য হাতে মাটির সরা নিয়ে যখন কোনো কিশোরী হেঁটে যায়, তখন বোঝা যায় আমাদের সংস্কৃতি কতটা শেকড়মুখী। বৈশাখ ফিরে আসুক বারবার আমাদের মনে করিয়ে দিতে যে বিভেদ আর অন্ধকার কোনোদিনই বাঙালির প্রাণশক্তিকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না। শুভ নববর্ষ।
শিমলা পাল
আইন বিভাগ,গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
