মঙ্গলবার ০৭, এপ্রিল ২০২৬

মঙ্গলবার ০৭, এপ্রিল ২০২৬ -- : -- --

ডিজিটাল শক্তির প্রশ্নে নতুন বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪৫ পিএম

ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট

বাংলাদেশে দ্রুত প্রসারমান ডিজিটাল অবকাঠামো নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুললেও এর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারের প্রশ্নে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। প্রযুক্তি কি মানুষের ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হবে, নাকি বাজারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত একটি কাঠামোতে পরিণত হবে—এই প্রশ্ন এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ কোটির বেশি এবং মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী প্রায় ১৮ কোটির কাছাকাছি পৌঁছেছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে চালু হয়েছে এক হাজারের বেশি ই-সেবা এবং প্রায় ৩৩ হাজার সরকারি ওয়েবসাইট যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল কাঠামোয়।

তবে এই অগ্রগতির পরও অন্তর্ভুক্তি, প্রবেশগম্যতা, গোপনীয়তা ও জবাবদিহির প্রশ্নে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সংযোগ বৃদ্ধি মানেই ক্ষমতায়ন নয়; বরং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও প্রকৃত ব্যবহারকারীর হার এখনো অর্ধেকের নিচে। পরিবারে মোবাইল ফোনের উপস্থিতি প্রায় সর্বজনীন হলেও কম্পিউটার ব্যবহারের হার অত্যন্ত কম।

লিঙ্গভিত্তিক ব্যবধানও স্পষ্ট—পুরুষদের তুলনায় নারীদের ইন্টারনেট ব্যবহার ও ডিভাইস মালিকানা কম। শহর ও গ্রামের মধ্যেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিসংখ্যান প্রযুক্তিগত নয়, বরং সামাজিক বৈষম্যের প্রতিফলন।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম মানুষের দৈনন্দিন জীবন সহজ করলেও একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও অ্যালগরিদমিক পক্ষপাতের ঝুঁকি তৈরি করছে।

ডিজিটাল অবকাঠামো এখন সড়ক বা বিদ্যুতের মতো মৌলিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। ফলে এর নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশাধিকার এবং ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণের প্রশ্ন সরাসরি নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইন্টারনেট ও টেক্সট সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ ও দৈনন্দিন জীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে ইন্টারনেট এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং জনজীবনের অপরিহার্য অবকাঠামো।

ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটলেও তা এখনো সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে সহজলভ্য নয়। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অনেক সেবা ব্যবহারযোগ্য নয়।

এক্ষেত্রে প্রবেশগম্যতা শুধু প্রযুক্তিগত নয়, বরং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, র‍্যাঙ্কিং বৃদ্ধি মানেই নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হওয়া নয়।

নাগরিকরা তাঁদের তথ্য কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, কোথায় সংরক্ষণ করা হচ্ছে বা কোনো সমস্যার প্রতিকার কোথায় পাবেন—এই বিষয়গুলো এখনো স্পষ্ট নয়।

জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি এই আলোচনাকে আরও জটিল করেছে। এটি যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি ভাষাগত বৈষম্য, পক্ষপাত ও তথ্য নিয়ন্ত্রণের নতুন ঝুঁকিও তৈরি করছে।

বাংলা ভাষা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হলে এআই নতুন বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডিজিটাল দক্ষতা এখন শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর নীতি, ঝুঁকি ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়াও জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকদের প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য এখন তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ,

প্রযুক্তি নীতিতে নাগরিক অধিকার ও ন্যায় নিশ্চিত করা
প্রবেশগম্যতা, গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতা বাধ্যতামূলক করা
প্রযুক্তি নীতিনির্ধারণে সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা

সবশেষে বলা হচ্ছে, প্রযুক্তির অগ্রগতি থামানো নয়, বরং তা মানুষের স্বার্থে পরিচালনা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Link copied!