সোমবার ০৯, মার্চ ২০২৬

সোমবার ০৯, মার্চ ২০২৬ -- : -- --

কেন বদর যুদ্ধের দামাম বেজে ওঠেছিল

স্বর্ণক শাহী

প্রকাশিত: ০৬ মার্চ ২০২৬, ১০:০৯ পিএম

ফাইল ফটো

ইসলামের ইতিহাসের প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ বদর। জালিমের বিরুদ্ধে মাজলুমের লড়াই। মিথ্যার বিরুদ্ধে ন্যায় ও ইনসাফের সংগ্রাম ।

এ যুদ্ধটি মুসলিমদের অস্তিত্বের সংকট থেকে মুক্তি দিন।জাতী হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঁচার দিন। মদীনায় হিজরতের মাত্র ১ বছর ৬ মাস ২৭ দিন পরে কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (স.)-কে মদীনা থেকে বের করে দেবার জন্য নানা অপচেষ্টা চালায়।

২য় হিজরির ১৭ই রমজান (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দ) মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে ইসলামের প্রথম ও সুনির্ধারক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। নবী (সা.)-এর নেতৃত্বে ৩১৩ জন মুসলিম ১,০০০ জন সুসজ্জিত কুরাইশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

কেন এই যুদ্ধের দামাম বেজে ওঠে?

মক্কার কুরাইশরা মদিনায় হিজরতের পর থেকেই মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল।

মহানবী (সা.) কুরাইশদের সিরিয়া থেকে মক্কায় ফেরার বাণিজ্য কাফেলা (যাতে অনেক সম্পদ ছিল) আটকানোর পরিকল্পনা করেন, যা কুরাইশদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারত ।

আবু সুফিয়ান তার কাফেলা নিয়ে নিরাপদে চলে যেতে পারলেও, মক্কার কুরাইশরা পূর্বের একটি হত্যাকাণ্ডের (আমর বিন আল-হাদরামি) প্রতিশোধ নিতে এবং মুসলমানদের দমাতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ।

অথচ দ্বিতীয় হিজরি বর্ষের রজব মাসের ১১ তারিখে মক্কার একজন গোত্র প্রধান আমর বিন আল-হাদরামি দুর্ঘটনাবশত মুসলমানদের হাতে নিহত হন। সেদিন নবী (সা)স্থানীয় ঐতিহ্য অনুসারে এই হত্যার জন্য ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করেন।

কিন্তু মক্কায় কুরাইশদের প্রধানরা এই ঘটনায় ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়।

ইবনে খালদুন লিখেছেন, আমর ইবনে আল-হাদরামির মৃত্যুতেই বদর যুদ্ধের প্রেক্ষাপট সূচিত হয়।

মদিনা সনদের ফলে মুহাম্মদ (স) সর্বোচ্চ সামরিক, বিচারিক, প্রশাসনিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধান হলে মদিনা রাষ্ট্র একটি শক্ত ভিত্তি লাভ করে। ফলে মক্কার কুরাইশগণ মুসলমানদের এ অগ্রগতিতে শঙ্কিত হয়ে তাদের ধ্বংস করার জন্য মদিনা আক্রমণে অগ্রসর হলে বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

এছাড়া মক্কায় কাফেরদের অত্যাচার, বার বার মদীনা আক্রমণের হুমকি,আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর ষড়যন্ত্র, মদিনার প্রান্তসীমায় লুটতরাজ সহ নানান কারনে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

স্থানটির নামকরণ ‘বদর’ করার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের কথা জানা যায়।

তারমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখ্যযোগ্যটি হলো, বদর বিন ইয়াখলাদ নামে এক ব্যক্তি এখানে একটি কূয়া খনন করেছিলেন।কূয়ার পানি ছিল খুবই স্বচ্ছ।

কথিত আছে, সেখানকার পানিতে চাঁদের প্রতিফলন ঘটতো। যেহেতু চাঁদকে আরবিতে বদরও বলা হয়, তাই উভয় দিকের সূত্র মিলিয়ে এই স্থানের নাম বদর রাখা হয়েছিল।

কুরাইশদের সম্পদ বোঝাই একটি কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কায় আসছিল। তখন গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, মুসলমানরা সেই বহরকে আক্রমণ করতে চায়।

আবু সুফিয়ান ছিলেন কাফেলার নেতা। তিনি সহায়তার জন্য মক্কায় দূত মারফত খবর পাঠান।

বার্তা পেয়ে মক্কা থেকে কুরাইশদের একটি দল আবু সুফিয়ানের কাফেলাকে সাহায্য করার জন্য মদিনার উদ্দেশে রওনা হয়।

সিরিয়া থেকে আগত কাফেলা মক্কায় পৌঁছে গিয়েছিল ঠিকই। অর্থাৎ, কুরাইশদের উচিত ছিল মদিনার দিকে যাওয়া কাফেলাকে ফেরত আনা।

কিন্তু, আবু জাহলের পীড়াপীড়িতে তারা মদিনার দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

১৬ই রমজান তারা বদর নামক স্থানটিতে শিবির স্থাপন করে। বলা হয়ে থাকে, এই পক্ষে লোক সংখ্যা ছিল নয়শো থেকে এক হাজার। তারা সবাই ছিল সশস্ত্র।

সংবাদ পেয়ে নবী(সা)বদরের উদ্দেশে অগ্রসর হন। ১৭ই রমজান ৩১৩ জন সঙ্গী নিয়ে তিনি ময়দানের কাছাকাছি পৌঁছান।

তখন পর্যন্তও কুরাইশদের মধ্যে শান্তিপ্রিয় কিছু ব্যক্তি যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু, আবু জাহেলের একগুঁয়েমির কারণে তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

ফলে, যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে।

নবী (সা)যখন কুরাইশদের বের হওয়ার কথা জানতে পারলেন, তখন সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন।

 

সেই পরামর্শ সভায় মুহাজিরগণ সুন্দর সাহসীকতাপূর্ণ পরামর্শ দিলেন । নবী এবার আনসারদেরপরামর্শ শুনতে চাচ্ছেন। তাই সা’দ বিন মুআয উঠে দাঁড়ালেন এবং আনসারদের পক্ষ হতে তিনি তাঁর সুপ্রসিদ্ধ কথাগুলো বললেন। তিনি তাতে রসূল (ﷺ) কে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন যে, আনসারগণ যুদ্ধ করার জন্য পূর্ণ প্রস্ত্তত রয়েছেন। সা’দ বিন মুআয বললেন- হে আল্লাহর রসূল! আপনি সম্ভবত আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। ঐ আল্লাহর শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। আপনি যদি আমাদেরকে ঘোড়া ছুটিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বলেন, তাহলে আমরা তাই করব। আপনি আমাদেরকে যেখানে যেতে বলেন, আমরা সেখানেই যাবো। এমন কি বারাকুল গামাদ (লোহিত সাগরের অপর প্রান্তের একটি অঞ্চলের নাম) পর্যন্ত যেতে বলেন, তাহলে আমরা সেখানে যেতেও দ্বিধাবোধ করবনা। মিকদাদ বিন আসওয়াদও অনুরূপ কথা বললেন- মিকদাদ (রাঃ) বললেন- মুসা (আঃ) এর অনুসারীরা যেরূপ বলেছিল আমরা সেরূপ বলবনা। তারা মুসাকে বলেছিল- আপনি এবং আপনার প্রভু তাদের (শত্রুদের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুন। আমরা এখানেই বসে থাকব। আর আমরা বলছিঃ আমরা আপনার ডানে, বামে সামনে এবং পিছনে তথা চতুর্দিক থেকেই যুদ্ধ করব। সাহাবীদের কথা শুনে বিশেষ করে এই দুই নেতার কথা শুনে নাবী (সা)খুব খুশী হলেন। তিনি বললেন- তাহলে তোমরা আগে বাড়, সামনে চল এবং সুসংবাদ গ্রহণ কর। আল্লাহ্ আমাকে কাফেরদের দুই দলের একটির উপর বিজয় দান করার ওয়াদা করেছেন। আর আমি কাফের নেতাদের নিহত হওয়ার স্থানগুলো দেখতে পাচ্ছি।

এরপর নবী(সা) সামনে চলতে লাগলেন এবং বদর প্রান্তরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। তিনি যখন মুশরিকদের মুখোমুখী হলেন এবং উভয় দল পরস্পরকে দেখতে পেল, তখন রসূল (সা) আল্লাহর দরবারে উভয় হাত তুলে দু’আ করতে লাগলেন :

ইয়া আল্লাহ্! এ অল্প সংখ্যক মুসলমান যদি যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হয়ে যায়, তাহলে দুনিয়াতে তোমার ইবাদত করার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।

সূরা আলে ইমরান ইরশাদ করেন

:‘বস্ত্তত আল্লাহ্ বদরের যুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করেছেন, অথচ তোমরা ছিলে দুর্বল। কাজেই আল্লাহ্কে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পার। তুমি যখন মুমিনগণকে বলতে লাগলে তোমাদের জন্য কি যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের সাহায্যার্থে তোমাদের প্রতিপালক আসমান থেকে অবতীর্ণ তিন হাজার ফিরিস্তা পাঠাবেন

এছাড়া তাঁর বাহিনীতে সেদিন ছিল আউস-খাজরাজের ঐতিহ্যবাহী যোদ্ধারা, আছে হামজার মতো সিংহ হৃদয়, উমরের মতো সাহসী আর আলি এবং সাদের মতো একদল তরুণ যুবা সর্বপরি আল্লাহর সাহায্য ফলশ্রুতিতে ১৪ জন মুসলিম শহীদ হন এবং ৭০ জন কুরাইশ বন্দী ও ৭০ জন নিহত হন আবু জাহল, উতবা, শায়বা সহ মক্কার অনেক প্রধান নেতা নিহত হন, কুরাইশদের নেতৃত্ব শূন্যতা সৃষ্টি হয় । ইসলাম শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় । কুরাইশদের সিরিয়াগামী বাণিজ্যিক পথ অনিরাপদ হয়ে পড়ে, যা তাদের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত হানে।কুরআন একে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী দিন হিসেবে উল্লেখ করেছে ।

 মুসলিমরা প্রচুর যুদ্ধের সরঞ্জাম ও গনীমতের মাল লাভ করেন।

বিখ্যাত আরব-আমেরিকান ঐতিহাসিক ফিলিপ কে. হিট্টি (Philip K. Hitti) তাঁর বিখ্যাত বই 'History of the Arabs' এ বদরের যুদ্ধকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, According to him, this battle was a turning point in the history of Islam. অর্থাৎ এই যুদ্ধটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট।

পরিশেষে কুরানের ভাষায় বলা যায় কত ছোট দল কত বৃহৎ দলের উপর আল্লাহর হুকুমে বিজয় লাভ করেছে।

আবুল কাসেম বিন মুহাম্মদ

শিক্ষার্থী

দাওয়া এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া mdabulkashem3721@gmail.com

Link copied!