প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:০৮ পিএম
বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। সোমবার (২ নভেম্বর) দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির দুই দশক পূর্তি উদযাপিত হয়।
দিবসটি উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তরের তত্ত্বাবধানে বাণী প্রচার করা হয়। এ ছাড়া জাতীয় দিবস উদযাপন কমিটি-২০২৬-এর উদ্যোগে জাতীয় পতাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন, বেলুন ও সাদা পায়রা উড্ডয়ন, কেক কাটা, বৃক্ষরোপণ এবং বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। পরে ‘সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিষ্ঠা, অর্জন ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় দিবস উদযাপন কমিটি-২০২৬-এর সভাপতি ও ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব ইকবালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্প মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট মো. রুহুল কবির রিজভী। প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সফি উল্যাহ মজুমদার।
বিশেষ অতিথি ছিলেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সিকৃবির সিন্ডিকেট সদস্য মোছা. তাহসিনা রুশদীর লুনা, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিক, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান ও বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের পরিচালক মো. বদরুজ্জামান সেলিম এবং সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইমদাদ হোসেন চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিকৃবির ট্রেজারার ড. এ.টি.এম. মাহবুব-ই-ইলাহী, ডিন কাউন্সিলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মজুমদার, অ্যাগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এ্যাব) আহ্বায়ক কৃষিবিদ ড. কামরুজ্জামান কায়সার এবং সদস্যসচিব কৃষিবিদ শাহাদাত হোসেন বিপ্লব।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকলে দেশের শিক্ষা ও কৃষি খাত এগিয়ে যায়। অতীতে শিক্ষা ব্যবস্থায় যে অগ্রগতি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বর্তমান সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার কাজ শুরু করেছে উল্লেখ করে এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি বলেন, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপনকারী, সিলেটের কৃতী সন্তান ও সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী প্রয়াত এম. সাইফুর রহমানের অবদান এ অঞ্চলের মানুষ চিরদিন স্মরণ করবে। তাঁর দূরদর্শী চিন্তা ও শিক্ষা বিস্তারের আগ্রহের ফলে সিলেট অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা ও কৃষিশিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
কৃষির উন্নয়নে সমন্বিত নীতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে রিজভী বলেন, কৃষি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম ভিত্তি। উৎপাদন, বাজার, প্রযুক্তি ও কৃষকের জীবনমান—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় না আনলে কৃষির প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব নয়। সমন্বিত কৃষিনীতি থাকলে দেশের সমৃদ্ধি আরও দ্রুত ও টেকসই হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক জমি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত বা পতিত অবস্থায় পড়ে আছে। এসব জমি চিহ্নিত করে চাষের আওতায় আনা গেলে কৃষি উৎপাদন বাড়বে এবং খাদ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। এ জন্য সঠিক জরিপ, মালিকানার স্বচ্ছতা, সেচব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
কৃষিজমি রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, উর্বর কৃষিজমি একবার হারিয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই আবাসন প্রকল্পের জন্য কৃষিজমির পরিবর্তে পতিত বা কম উৎপাদনশীল জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। কার্যকর ভূমি ব্যবহার নীতিমালার মাধ্যমে উন্নয়ন ও খাদ্য উৎপাদনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব।
কৃষকদের সহায়তা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, হতদরিদ্র কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু বর্তমান সরকারের একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে সহজ ঋণ, ভর্তুকিযুক্ত কৃষি উপকরণ ও সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের উৎপাদনশীলতা ও আয় বাড়বে। তবে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে এ সুবিধা পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি ও যাচাই করা জরুরি।
এ সময় তিনি উন্নত দেশের মতো শিক্ষা ঋণ চালুর উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন। এর মাধ্যমে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধান বক্তার বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কৃষিশিক্ষা ও গবেষণায় যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষির আধুনিকায়ন ও কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞান মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার অগ্রযাত্রা আরও বেগবান করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দক্ষ, সৎ, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক কৃষিবিদ তৈরি হবেন, যাঁরা দেশের কৃষি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন—এটাই প্রত্যাশা।
দিনব্যাপী আয়োজনের শেষ পর্বে সন্ধ্যা ৬টায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি শেষ হয়।
