বৃহস্পতিবার ২২, অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার ২২, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

রঙিন হীরামণ টিয়ার খোজে প্রকৃতিপ্রেমীদের মেলা

স্বর্ণক শাহী

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম

হীরামণ টিয়া

হেমন্তের শিশিরভেজা সকাল। চারদিকে সবুজ ফসলের মাঠ, বাতাসে দুলছে ধানের শিষ। এরই মধ্যে কখনো সবুজ পাতার আড়াল থেকে, কখনো ধানখেতের ওপর দিয়ে ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাচ্ছে রঙিন হীরামণ টিয়া। কখনো ধানের শিষ থেকে খাবার সংগ্রহ, কখনো ডানা মেলে এক মাঠ থেকে অন্য মাঠে পাড়ি। প্রকৃতির এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য যেন গ্রামবাংলার চিরচেনা সৌন্দর্যে যোগ করেছে নতুন এক রঙ।

এই পাখিদের দেখতে এখন প্রকৃতিপ্রেমী ও ফটোগ্রাফারদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের দোনইল গ্রামের ফসলের মাঠ। পাখির স্বাভাবিক বিচরণের মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় ধরে রাখতে ঢাকা, রাজশাহী, জয়পুরহাটসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ছুটে আসছেন আলোকচিত্রীরা।

গত রোববার (১৮ অক্টোবর) ভোরেও দোনইল গ্রামের মাঠে দেখা গেছে হীরামণ টিয়ার এমন মনোমুগ্ধকর বিচরণ। ভোরের আলো ফুটতেই পাখিদের আনাগোনা শুরু হয়। কখনো ধানের শিষে বসে খাবার খাচ্ছে, কখনো ডানা ঝাপটাচ্ছে, আবার মুহূর্তেই দল বেঁধে উড়ে যাচ্ছে দূরের কোনো ফসলের মাঠে। পাখিদের এই চঞ্চলতা আর রঙিন উপস্থিতি মুগ্ধ করছে মাঠে আসা দর্শনার্থীদের।

পাখির টানে ভোরেই মাঠে ফটোগ্রাফাররা
হীরামণ টিয়ার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে ভোর থেকেই দোনইল গ্রামের মাঠে জড়ো হন বিভিন্ন বয়সী ফটোগ্রাফার। কারও হাতে বড় লেন্সের ক্যামেরা, কারও হাতে ভিডিও ধারণের সরঞ্জাম। পাখিদের বিরক্ত না করে দূর থেকে তাদের স্বাভাবিক চলাফেরা ক্যামেরাবন্দি করার চেষ্টা করেন তারা।

জয়পুরহাট থেকে আসা ফটোগ্রাফার সোহেল রানা জানান, হীরামণ টিয়ার ছবি ও ভিডিও ধারণের জন্য খুব ভোরে বদলগাছীর ফসলের মাঠে এসেছেন তিনি। মাঠের ওপর পাখিদের উড়ে বেড়ানো এবং ধানের শিষ থেকে খাবার সংগ্রহের দৃশ্য ধারণ করতে পেরে তিনি আনন্দিত।

আক্কেলপুর উপজেলা থেকে আসা পাখিপ্রেমী রাজনের অভিজ্ঞতাও ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। তিনি জানান, হীরামণ টিয়ার দেখা পেতে ভোরে মাঠে এসে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। সকাল ৭টার দিকে পাখিগুলোর দেখা মেলে। এরপর ধানখেত থেকে শিষ নিয়ে অন্য ফসলের মাঠে উড়ে যাওয়ার দৃশ্য উপভোগ করেন তিনি।

রাজনের ভাষায়, পাখিদের এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। প্রকৃতির কাছাকাছি গিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন দেখার মধ্যে রয়েছে অন্য রকম আনন্দ।

নির্দিষ্ট সময়ে আসে পাখির দল
দোনইল গ্রামের স্কুলশিক্ষক ও ফটোগ্রাফার সঞ্জয় কুমারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে দোনইল ও পাশের মহদীপুর এলাকার ফসলের মাঠে হীরামণ টিয়ার দেখা মিলছে। সাধারণত ভোর ৬টা থেকে সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত পাখিগুলো মাঠে খাবার খায়। আবার বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যেও তাদের দেখা যায়।

পাখিদের এই নিয়মিত উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়ায় দূরদূরান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমী ও ফটোগ্রাফাররা এলাকাটিতে আসছেন। কেউ পাখিদের ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন প্রকৃতির এই অনন্য দৃশ্য।

পাখিদের জন্য নিজের জমিতে ঘাসের চাষ
হীরামণ টিয়ার অবাধ বিচরণ ধরে রাখতে দোনইল গ্রামের পাখিপ্রেমী যুবক আরিফ আফরান নিয়েছেন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। পাখিদের খাবারের ব্যবস্থা করতে তিনি নিজ খরচে নিজের জমিতে বিদেশি জনসন ঘাসের চাষ করেছেন।

আরিফ আফরানের ভাষ্য, প্রতিদিন ভোরে হীরামণ টিয়ার দল ওই ঘাস খেতে আসে। পাখিদের দেখতে ও ছবি তুলতে প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন ফটোগ্রাফার সেখানে উপস্থিত হন। এ পর্যন্ত শতাধিক ফটোগ্রাফার তাঁর জমিতে এসে হীরামণ টিয়ার ছবি ধারণ করেছেন।

পাখিদের প্রতি ভালোবাসা থেকে নেওয়া তাঁর এই উদ্যোগ প্রকৃতির প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত। নিজের জমিকে পাখিদের খাবার সংগ্রহের উপযোগী করে তোলার মাধ্যমে তিনি পাখিপ্রেমীদের জন্যও তৈরি করেছেন একটি আকর্ষণীয় স্থান।

প্রকৃতির সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা
গ্রামবাংলার ফসলের মাঠ, ধানের শিষ আর পাখির কলকাকলি এই তিনের মেলবন্ধন বাংলার প্রকৃতিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র রূপ। বদলগাছীর দোনইল গ্রামের হীরামণ টিয়ার বিচরণ সেই সৌন্দর্যকে নতুন করে তুলে ধরছে প্রকৃতিপ্রেমীদের সামনে।

পাখিদের দেখতে আসা মানুষের ভিড় যেমন এলাকাটিকে নতুনভাবে পরিচিত করছে, তেমনি পাখিদের স্বাভাবিক বিচরণ উপভোগ করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে নানা বয়সী মানুষের জন্য। ক্যামেরার লেন্সে বন্দি হওয়া প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠছে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার স্মারক।

তবে এই সৌন্দর্য ধরে রাখতে পাখিদের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করাও জরুরি। পাখিদের খুব কাছে না যাওয়া, অযথা শব্দ না করা, খাবার সংগ্রহে বাধা না দেওয়া এবং তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল রক্ষা করা এসব বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন।

সবুজ ফসলের মাঠে রঙিন হীরামণ টিয়ার অবাধ ওড়াউড়ি তাই কেবল চোখের প্রশান্তি নয়; এটি প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি মানুষের ভালোবাসারও এক অনন্য প্রকাশ। নওগাঁর বদলগাছীর এই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতিকে তার নিজস্ব ছন্দে বাঁচতে দেওয়া গেলে গ্রামবাংলার চিরচেনা মাঠও হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ সৌন্দর্যের এক জীবন্ত ক্যানভাস।

Link copied!