মঙ্গলবার ২০, অক্টোবর ২০২৬

মঙ্গলবার ২০, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

শিক্ষা, বাড়িভাড়া ও মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২০ পিএম

ইউরোপজুড়ে তরুণদের বিক্ষোভ, ক্ষোভের কেন্দ্রে শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয়

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, আলবেনিয়া ও বেলজিয়ামে বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ চলছে। কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা, কোথাও আবাসনসংকট, আবার কোথাও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আন্দোলনের মূল কারণ হয়ে উঠেছে।

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, যোগ দিয়েছেন অন্যরাও

ফ্রান্সে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ক্লাস, শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে আন্দোলন করছেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মাসের পর মাস নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিক্ষোভের সময় কিছু এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষও হয়েছে।

পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে আরও অনেকে যোগ দেন। জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা। বিক্ষোভকারীদের একাংশের অভিযোগ, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব জ্বালানির বাজার ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়েছে।

ফ্রান্সের বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠনগুলোর একটি জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার (সিজিটি) আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটি দ্রব্যমূল্য কমানো, পেনশন বৃদ্ধি ও মজুরি বাড়ানোর দাবি তুলেছে।

প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এ বিক্ষোভ তাঁর সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।

স্পেনে বাড়িভাড়া ও উচ্ছেদের প্রতিবাদ

ফ্রান্সের প্রতিবেশী স্পেনেও আবাসনসংকট ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে তাঁর বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ জোরালো হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি বিনিয়োগ তহবিল তাঁর বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ার পর তিনি বাসস্থান হারান। পরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই সপ্তাহ পর তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি দেশটিতে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি ও ভাড়াটিয়াদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে।

বিক্ষোভকারীরা বাড়িভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ এবং বিনিয়োগ তহবিলের সম্পত্তি কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন।

পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ

একই দাবিতে গত শনিবার পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। দেশটিতে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাড়ির দাম ১২৪ শতাংশ বেড়েছে। এ বৃদ্ধির হার ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গড় বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ।

বাড়ির দাম ও ভাড়া বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের আবাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিক্ষোভকারীরা আবাসন ব্যয় কমানো এবং বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

ইতালিতে বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতা

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ইতালির মিলানেও গত শনিবার বিক্ষোভ হয়। শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও একপর্যায়ে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুখোশ পরা কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথরসহ বিভিন্ন বস্তু ছুড়তে থাকেন। তাঁরা টেবিল দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডেও আগুন ধরিয়ে দেন।

আলবেনিয়ায় দুর্নীতি ও কর্মসংস্থান নিয়ে ক্ষোভ

আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ গত রোববার ষষ্ঠ দিনে গড়ায়। দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিক্ষাব্যবস্থার নিম্নমান নিয়ে অসন্তোষ থেকে আন্দোলন চলছে বলে জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।

গ্রীষ্মকাল থেকেই দেশটিতে আন্দোলন শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনে নেওয়া একটি বিলাসবহুল উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল।

বিক্ষোভের সূচনা ও বিস্তার

গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয় এবং গত শনিবার তা তীব্র আকার ধারণ করে। একই দিনে ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়। অন্যদিকে, আলবেনিয়ায় গ্রীষ্মকাল থেকেই সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে।

আন্দোলনের মুখে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার

ফ্রান্সে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় আরও তিন হাজার খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। স্কুলসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। আগামী বছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ভর্তি ফি বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে সরকার।

এর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জ্বালানির দাম নিয়ে বিক্ষোভের পর নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে পেট্রলে ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়।

স্পেনে ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষায় জরুরি আবাসন আইন পাসের উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তবে কংগ্রেসে ডানপন্থী ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর বিরোধিতার কারণে আইনটি পাস হয়নি। পরে সানচেজ ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের আহ্বান জানান। আবাসন খাতে নতুন সংস্কার বাস্তবায়নে আরও বিস্তৃত প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিক্ষোভ থামবে কি না, অনিশ্চয়তা

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং পরে টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের বক্তব্যে বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তিনি ‘কট্টর বামপন্থী’ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ভবনে লুটপাট ও ভাঙচুরের অভিযোগ করেছেন।

ফ্রান্সে ২০২৭ সালের এপ্রিলে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, স্পেনে আবাসনসংক্রান্ত অধ্যাদেশ পাসের উদ্যোগ এবং আসন্ন নির্বাচনে বাড়ি নির্মাণ ও আবাসনসংকট মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এসব আন্দোলনে শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে সরকারগুলোর নেওয়া পদক্ষেপে বিক্ষোভ কতটা প্রশমিত হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

Link copied!