প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৮ পিএম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের খেলার মাঠের জায়গায় নির্মিত হচ্ছে নতুন কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি। নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হওয়ায় মাঠটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে লাইব্রেরির পাশে মাঠ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি উঠেছে।
হলের শিক্ষার্থীরা মাঠ ফিরে পাওয়ার দাবি জানালেও অন্য শিক্ষার্থীদের একাংশের আশঙ্কা, এতে লাইব্রেরির পড়াশোনার পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। মাঠ নির্মাণে গাছ কাটার বিরোধিতা করেছে পরিবেশবাদী ও বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো ছাড়াও আরও কিছু সংগঠন। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ছয়তলা কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও লেকচার থিয়েটার-কাম-পরীক্ষার হল নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে অনুমোদিত প্রকল্পটির আওতায় নতুন লাইব্রেরির নির্মাণকাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পুরোনো লাইব্রেরিতে আসন সংকটের কারণে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে পুরোনো ভবন ভাঙা সম্ভব না হওয়ায় পরে আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের খেলার মাঠে নতুন লাইব্রেরি নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, হল প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের আলোচনার ভিত্তিতেই ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
মাঠ ফিরে চান হলের শিক্ষার্থীরা
আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের শিক্ষার্থীদের দাবি, লাইব্রেরি নির্মাণের জন্য সাময়িকভাবে তাদের মাঠের জায়গা নেওয়া হয়েছিল। নির্মাণকাজ শেষ হলে মাঠটি ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। তাই তারা মাঠ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগকে ন্যায্য দাবি পূরণের অংশ হিসেবে দেখছেন।
হলের ৪৯তম ব্যাচের আবাসিক শিক্ষার্থী জি এম এম রায়হান কবির বলেন, ‘মাঠটি আমাদের হলের। অনেক আগেই এটি আমাদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল। কথা ছিল, লাইব্রেরির নির্মাণ শেষ হলেই হলের জায়গা আমাদের হাতে হস্তান্তর করা হবে।’
গাছ কাটার সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, আগে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের সময় গাছ কাটা হলেও তেমন প্রতিবাদ দেখা যায়নি। মাঠ নির্মাণে গাছ কাটতে হলে নতুন গাছ লাগানোর কথাও জানান তিনি।
লাইব্রেরির পরিবেশ ও গাছ কাটা নিয়ে আপত্তি
অন্য শিক্ষার্থীদের একাংশের আশঙ্কা, লাইব্রেরির পাশে মাঠ হলে খেলাধুলার শব্দে পাঠক ও পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটবে। ক্রিকেট-ফুটবল খেলার সময় বলের আঘাতে জানালার কাচ ভেঙে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, কাছাকাছি কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ থাকায় বিকল্প স্থান বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী আলতাফ মাহমুদ বলেন, ‘লাইব্রেরির সামনে মাঠ হলে সব সময় কোলাহল থাকবে। এতে পড়াশোনার ক্ষতি হবে। ক্রিকেট-ফুটবল খেলার সময় কাচ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, মাঠ নির্মাণে গাছ কাটার বিষয়টিও উদ্বেগজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি অদ্রি অংকুর বলেন, লাইব্রেরির পাশে মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ অপরিকল্পিত। এতে একদিকে পাঠপরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে মাঠ নির্মাণের জন্য আরও গাছ কাটতে হতে পারে।
ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ফাইজান আহমেদ অর্ক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের দাবি দীর্ঘদিনের। পরিকল্পনার যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় নানা সংকট তৈরি হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি
আলোচনার কথা বলছে প্রশাসন
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, লাইব্রেরি নির্মাণের সময় তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, হল প্রশাসন ও শিক্ষার্থীরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তখন আপত্তি ওঠেনি। তবে মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে এখন প্রশ্ন ওঠায় সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল ইসলাম বলেন, হলের মাঠের জায়গায় লাইব্রেরি নির্মাণের বিষয়ে তিনি অবগত নন। বিষয়টি যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়া কোনো কাজ করা উচিত নয়। তবে অপ্রয়োজনে গাছ কাটাও উচিত নয়।’
অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন বলেন, পুরোনো লাইব্রেরি ভবন ভাঙতে না পারায় নতুন লাইব্রেরি ও লেকচার থিয়েটার-কাম-পরীক্ষার হলের অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের সিদ্ধান্ত ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ করা হয়েছে।
মাঠ নির্মাণের আগে পরিবেশগত প্রভাব, শব্দদূষণ, লাইব্রেরির নিরাপত্তা কিংবা বিকল্প স্থান নিয়ে কোনো সমীক্ষা করা হয়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। একইভাবে, মাঠের জায়গা ব্যবহারের বিষয়ে হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো লিখিত সমঝোতা না করেই শুধু মৌখিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
ফলে মাঠ পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে। হলের শিক্ষার্থীদের দাবি, লাইব্রেরির পরিবেশ ও ক্যাম্পাসের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতে হবে।
