প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম
ঢাকা-সিলেট রেলপথে সাধারণ যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ট্রেন ছিল সুরমা মেইল। কম ভাড়া এবং পথে বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রাবিরতির কারণে ট্রেনটি শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ স্বল্প আয়ের মানুষের যাতায়াতে ভূমিকা রাখত। কিন্তু ইঞ্জিনসংকটের কারণে ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই থেকে ট্রেনটির চলাচল বন্ধ রয়েছে। এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এর পুনরায় চালুর বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় যাত্রীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে-সুরমা মেইল আবার কবে চালু হবে?
সুরমা মেইলের নামের সঙ্গে এই অঞ্চলের রেল যোগাযোগের ইতিহাসও জড়িত। ঐতিহাসিক বিবরণে ব্রিটিশ আমলে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের অধীনে চাঁদপুর থেকে আসামের শিলচর পর্যন্ত সুরমা মেইল নামে ট্রেন চলাচলের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ঢাকা-সিলেট রুটেও এই নামে ট্রেন চালু হয়। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের ১৫ জানুয়ারি এই রুটে সুরমা মেইলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর দীর্ঘদিন ধরে ট্রেনটি ঢাকা ও সিলেটের মধ্যবর্তী বিভিন্ন এলাকার মানুষের যাতায়াতের একটি পরিচিত মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
ট্রেনটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল পথে অধিকসংখ্যক স্টেশনে যাত্রাবিরতি। কমলাপুর থেকে টঙ্গী, নরসিংদী, ভৈরব বাজার, আখাউড়া, শায়েস্তাগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া হয়ে সিলেটে যেত ট্রেনটি। বড় স্টেশনের পাশাপাশি ছোট স্টেশনগুলোতেও থামার কারণে যেসব এলাকার যাত্রীদের জন্য আন্তনগর ট্রেন ব্যবহার করা সুবিধাজনক ছিল না, তাঁদের কাছে সুরমা মেইল ছিল একটি কার্যকর বিকল্প। বিভিন্ন সূত্রে একসময় ট্রেনটির প্রায় ৫৯টি স্টেশনে যাত্রাবিরতির তথ্য পাওয়া যায়; পরবর্তী সময়ে তা কমে প্রায় ৩৯টিতে নেমে আসে।
সুরমা মেইলের গুরুত্ব বুঝতে হলে এর যাত্রীদের প্রয়োজন বিবেচনা করা জরুরি। সব যাত্রীর কাছে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোই একমাত্র বিবেচ্য নয়। অনেকের জন্য ভাড়া, বাড়ির কাছাকাছি স্টেশন থেকে ওঠার সুযোগ এবং নিয়মিত যাতায়াতের সুবিধাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের যাত্রীদের প্রয়োজন পূরণে মেল ও লোকাল ট্রেনের ভূমিকা রয়েছে। ফলে একটি ট্রেন বন্ধ হওয়ার বিষয়টি মূল্যায়নের সময় শুধু ঢাকা ও সিলেটের মধ্যে যোগাযোগের বিকল্প আছে কি না, তা দেখলেই যথেষ্ট নয়; মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোর যাত্রীরা কী সুবিধা হারিয়েছেন, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সুরমা মেইল বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে এতে তাঁদের যাতায়াত ব্যয় কতটা বেড়েছে, কতজন যাত্রী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কিংবা কোন কোন স্টেশনে যাত্রীদের অসুবিধা বেশি হচ্ছে—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বাংলাদেশ রেলওয়ে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে এসব বিষয় পর্যালোচনা করা গেলে ট্রেনটির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
এখানে রেলওয়ের সেবার অগ্রাধিকার নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। আন্তনগর ট্রেনের গতি, সময়ানুবর্তিতা ও যাত্রীসুবিধা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কম ভাড়ায় দীর্ঘ পথের বিভিন্ন স্টেশনে যাতায়াতের সুযোগ রাখাও জরুরি। বড় শহরগুলোর মধ্যে যোগাযোগ উন্নত করার পাশাপাশি ছোট স্টেশননির্ভর যাত্রীদের চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সব রুটে একই ধরনের ট্রেন দিয়ে সব যাত্রীর প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব নয়।
রেলওয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ইঞ্জিনসংকটের কারণে সুরমা মেইলের চলাচল বন্ধ হয়েছিল। তবে ট্রেনটি পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে বর্তমান বাধাগুলো কী, প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না এবং চালুর কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ থাকলে তার বিকল্প হিসেবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটিও কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা করা উচিত।
সুরমা মেইল পুনরায় চালু করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যাত্রীচাহিদা, পরিচালন ব্যয়, ইঞ্জিনের প্রাপ্যতা এবং রুটটির সামগ্রিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সিদ্ধান্তটি যেন শুধু ট্রেন পরিচালনার সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে না থাকে; স্বল্প আয়ের যাত্রীদের যাতায়াতের প্রয়োজনও যেন মূল্যায়নে গুরুত্ব পায়।
সুরমা মেইলের চলাচল বন্ধ হওয়ার এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এখন প্রয়োজন ট্রেনটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য এবং পুনরায় চালুর বিষয়ে রেলওয়ের অবস্থান জানা। ট্রেনটি চালুর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকলে তা প্রকাশ করা উচিত; আর চালু করা সম্ভব না হলে তার কারণও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
সুরমা মেইল ফিরবে কি না, তা নির্ভর করছে রেলওয়ের সিদ্ধান্ত ও বাস্তব সক্ষমতার ওপর। তবে কম ভাড়ায় মধ্যবর্তী স্টেশনগুলোর যাত্রীদের যাতায়াতের যে প্রয়োজন ট্রেনটি পূরণ করত, সেটিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই প্রশ্নটি শুধু একটি ট্রেনের অনুপস্থিতি নিয়ে নয়; বরং রেল যোগাযোগের পরিকল্পনায় সাধারণ ও স্বল্প আয়ের যাত্রীদের প্রয়োজন কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, তা নিয়েও।
