মোঃ শোয়েব বিন জামান। রুয়েট প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৩ এএম
সোমবার ১২, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --
সংগৃহীত
পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আপত্তি ও দাবির মুখে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং (ইসিই) বিভাগের শিল্প-উপদেষ্টা প্যানেল (আইএপি) থেকে সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) বিকেলে অনুষ্ঠিত বিভাগের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শনিবার বিকেল তিনটায় তাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আইএপি থেকে একজন সদস্যকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় উপস্থিত সদস্যরা সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদকে প্যানেল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। তবে বিজ্ঞপ্তিতে তাঁকে বাদ দেওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রুয়েট ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (আরডিএফ) নামের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কোরআন ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদের কিছু মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর এ নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। রুয়েটের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং ইইই, ইসিই, ইটিই ও এমটিই বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গ্রুপটি গঠিত। কোরআনবিষয়ক একটি কোর্স নিয়ে আলোচনার সময় তাঁর এসব মন্তব্য আসে বলে জানা গেছে।
গ্রুপে দেওয়া বার্তায় সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদ কোরআনকে ‘ইশারা গ্রন্থ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে শিক্ষার্থীরা জানান, তিনি বিজ্ঞানবিষয়ক বইয়ের পরিবর্তে এ গ্রন্থ থেকে শিক্ষা দেওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। একই সঙ্গে কোরআনকে বিজ্ঞানের বই নয়, বরং নিদর্শনের গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রকৌশলীদের পণ্য নকশা ও নির্মাণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কোরআনের জ্ঞান ব্যবহারের বিষয়েও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে কোরআনে বিমান তৈরি, প্রযুক্তিগত বিপ্লব, বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা যন্ত্র নির্মাণের পদ্ধতি নিয়ে আয়াত না থাকার প্রসঙ্গও উঠে আসে।
এ ছাড়া কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে তাঁর কিছু মন্তব্যে আপত্তি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের ভাষ্য, একটি বার্তায় তিনি সূরা আন-নিসার ৩৪ নম্বর আয়াতের প্রসঙ্গ টেনে পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে মন্তব্য করেন। অন্য একটি বার্তায় সূরা আত-তাগাবুনের ১৪ নম্বর আয়াতের প্রসঙ্গ তুলে সন্তান ও মায়ের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক নিয়ে বক্তব্য দেন। এসব মন্তব্যকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থের প্রতি অবমাননা হিসেবে দেখছেন ইসিই বিভাগের একাংশের শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীরা এসব বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদকে আইএপি থেকে অবিলম্বে বাদ দেওয়া এবং ভবিষ্যতে বিভাগের কোনো কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত না রাখার দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্য, ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ নিয়ে এমন মন্তব্যের কারণে তাঁরা ক্ষুব্ধ এবং তাঁকে উপদেষ্টা প্যানেলের সদস্য হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন।
ধর্মীয় বক্তব্যের পাশাপাশি বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রম ও পাঠ্যক্রমে তাঁর প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, রুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী বা বিভাগের শিক্ষক না হয়েও সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদ বিভাগের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছিলেন। তাঁর পরামর্শে কিছু মৌলিক কোর্সের পরিবর্তে মাইক্রোকন্ট্রোলারভিত্তিক কাজের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি।
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ‘ইলেকট্রনিক শপ প্র্যাকটিস’ কোর্সে এসটিএম৩২-সংক্রান্ত সেশনে উপস্থিতির ওপর ২০ শতাংশ নম্বর রাখার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তাঁরা। এ ছাড়া থিসিসের পরিবর্তে প্রকল্পভিত্তিক কাজকে প্রাধান্য দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব বিষয়ে বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে ইসিই বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “শিক্ষার্থীদের কিছু যৌক্তিক দাবি-দাওয়া ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে শিল্প-উপদেষ্টা প্যানেলের একজন সদস্যের ধর্মীয় বিষয়ে বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীরা আপত্তি জানায় এবং তাঁকে প্যানেল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তোলে। শিক্ষার্থীদের এই আবেগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্যানেল থেকে অব্যাহতি দিয়েছি।”
শিক্ষার্থীদের অন্যান্য দাবি প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ল্যাব সংস্কার, প্রকল্প ও ওয়ার্কশপের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ল্যাব বা ওয়ার্কশপের কার্যক্রম বাধ্যতামূলক না রেখে ঐচ্ছিক করার বিষয়ে তাঁরা একমত হয়েছেন। বিভাগের সার্বিক উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত অগ্রগতির জন্য প্রশাসন কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
জানা গেছে, সাঈদ ইমতিয়াজ আহমেদ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ১৯৭৫ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সিগন্যাল স্ট্রিম ইনকরপোরেটেডের সভাপতি।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে যোগাযোগের উদ্দেশ্যে গঠিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে একজন বহিরাগত ব্যক্তির উপস্থিতি এবং বিভাগের পাঠ্যক্রমে তাঁর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ একাডেমিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁদের মতে, আইএপি থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নেওয়া হয়েছে।