সোমবার ০৫, অক্টোবর ২০২৬

সোমবার ০৫, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিরল হল ডাকাতির শিকার যবিপ্রবি, ৯ বছরেও মেলেনি বিচার

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৮ এএম

সংগৃহীত

 

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও ন্যক্কারজনক ঘটনা ‘হল ডাকাতি’। ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মসিয়ূর রহমান হলে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ওই ঘটনা ঘটে। ওই রাতে প্রায় ৩০০টি মোবাইল ফোন, ১০০টি ল্যাপটপ ও নগদ অর্থ লুট করা হয়েছিল। লুট ও ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের আর্থিক মূল্য ছিলো প্রায় ৪১ লাখ টাকা । ঘটনার নয় বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার ও ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

 

তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসানের নেতৃত্বে একদল মুখোশধারী ব্যক্তি হলে প্রবেশ করে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় আহত হন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাসসহ ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী । 

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাত শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করে এবং তাঁদের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৩০ থেকে ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। তবে নয় বছর পরও সেই মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য জানাতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এখনো পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।

 

জানা যায়, দুই পক্ষের রাজনৈতিক বিরোধ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান শুরুতে একই রাজনৈতিক বলয়ের অনুসারী ছিলেন। পরে ২০১৭ সালের প্রথম দিকে শামীম হাসান কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক লবিং পরিবর্তন করলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হয়। ওই বছরের মে মাসে সুব্রত বিশ্বাসের পক্ষ শামীমের গ্রুপকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করে । এর কয়েক মাস পর ৫ অক্টোবর রাতে হলে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

 

প্রত্যক্ষদর্শী ও নিরাপত্তাকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, ওই রাত আনুমানিক ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে তিন থেকে চারটি কালো মাইক্রোবাস আসে। মুখোশধারী কয়েকজন ব্যক্তি দুই আনসার সদস্যকে মারধর করে তাঁদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একদল মুখোশধারী ব্যক্তি হলে প্রবেশ করে ফাঁকা গুলি চালিয়ে শিক্ষার্থীদের কক্ষগুলোতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় বলে অভিযোগ করা হয়।

 

ভুক্তভুগী এক শিক্ষার্থী জানান, হামলাকারীরা তাঁকে ও তাঁর কক্ষে থাকা এক জুনিয়র শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে মোবাইল, ল্যাপটপ ও টাকা নিয়ে যায়। আতঙ্কে অনেক শিক্ষার্থী লুঙ্গি পরে খালি গায়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে লাফ দিয়ে নিচে নেমেছিলেন। কেউ কেউ শিক্ষক ডরমিটরিতে আশ্রয় নেন।

 

তবে ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা ও লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান। তাঁর দাবি, ঘটনার দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানের বিষয়ে তিনি তৎকালীন উপাচার্য ও হল প্রভোস্টকে আগে থেকেই জানিয়েছিলেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে প্রক্টর ও প্রভোস্টের নেতৃত্বে পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, শিক্ষার্থীদের কোনো জিনিস তাঁরা লুট বা ছিনতাই করেননি এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও মামলা করা হয়েছিল।

 

তৎকালীন শ.ম.র হলের প্রভোস্ট ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ঘটনার দিন তিনি ঢাকায় ছিলেন এবং হলে শামীমদের অবস্থানের বিষয়ে অবগত ছিলেন না। তাঁর দাবি, ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত আনুমানিক ৯০ থেকে ৯৫ জন শিক্ষার্থী আবেদন করলে মেডিকেল সার্টিফিকেট ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই করে নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের সহায়তা করা হয়েছিল।

 

তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক শেখ মিজানুর রহমান জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে কয়েকজন শিক্ষক ও নিরাপত্তাকর্মীকে নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশের উপস্থিতি দেখতে পান। তৎকালীন উপাচার্যের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা হলে প্রবেশ করে শামীম হাসানকে চলে যেতে বলেন। তবে লুট হওয়া ল্যাপটপ, মোবাইল বা মূল্যবান জিনিস তিনি নিজ চোখে দেখেননি বলে জানান।

 

তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন শামীম হাসানের সঙ্গে ঘটনার রাতে যোগাযোগের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, তিনি ওই রাতে বগুড়ায় ছিলেন। যশোরের তৎকালীন এএসপি রব্বানীর সঙ্গে কথা হওয়ার পর তিনি প্রক্টরকে পুলিশের সঙ্গে হলে যেতে বলেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার পর এক মাস শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে মোট কত টাকা দেওয়া হয়েছিল, তা তাঁর মনে নেই।

 

ক্ষতিপূরণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিপরীতে তৎকালীন উপাচার্য আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছিল। তবে ক্ষতিপূরণের দায় কার, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। একই সঙ্গে ঘটনাটিকে ছাত্ররাজনীতির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল হিসেবে উল্লেখ করেন।

 

ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আবেদন নেওয়া হয়। তবে কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তাঁরা আবেদন করেও প্রত্যাশিত সহায়তা পাননি। 

 

ঘটনার নয় বছর পূর্ণ হলেও বিচার ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন এখনো সামনে রয়ে গেছে। একদিকে রয়েছে শিক্ষার্থীদের লুটপাট, হামলা ও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে তৎকালীন অভিযুক্তদের অভিযোগ অস্বীকার ও রাজনৈতিক পক্ষপাতের দাবি। আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সে সময় নেওয়া পদক্ষেপের কথা বলা হলেও মামলার বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

 

তবে এই বিষয়ে যবিপ্রবির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর আশ্বাস দিয়ে বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত। পূর্বের তদন্ত প্রতিবেদন ও মামলার কাগজপত্রগুলো দেখতে হবে। সবকিছু জেনে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

Link copied!