বৃহস্পতিবার ০১, অক্টোবর ২০২৬

বৃহস্পতিবার ০১, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

রুয়েটের হলে ইমাম নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্ত দাবি শিক্ষার্থীদের

মোঃ শোয়েব বিন জামান। রুয়েট প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম

ছবি| ক্যাম্পাস রিপোর্ট

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হলের মসজিদে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া ইমামের বিরুদ্ধে অশুদ্ধ তিলাওয়াত, মাসআলা-সংক্রান্ত ভুল, অতিরিক্ত ছুটি নেওয়া ও নির্ধারিত সময়ের বাইরে আজান দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে তাঁর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রায় ৩০০ প্রার্থীকে পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষার জন্য প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হলেও আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা শুরুর আগেই ওই ইমামকে হল মসজিদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিয়োগে অস্বচ্ছতা, প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
জানা যায়, প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থীর আবাসিক হলটিতে দীর্ঘদিন স্থায়ী ইমাম না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে তিলাওয়াতে পারদর্শী শিক্ষার্থীদের দিয়ে প্রায় এক বছর নিয়মিত ইমামতির দায়িত্ব পালন করান। পরে হল মসজিদে স্থায়ী ইমাম নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে তাঁদের মতামত প্রশাসনের কাছে জানান।
এ বিষয়ে মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (এমটিই) বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাজিদ বলেন, হল প্রশাসন তখন জানায়, হলের ফান্ডে অমুসলিম শিক্ষার্থীদের ফিও অন্তর্ভুক্ত থাকায় প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। পরে শিক্ষার্থীরা ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম সরকার বরাবর ইমাম নিয়োগের জন্য লিখিত আবেদন করেন। তখন কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে জানায়, রুয়েটে কেন্দ্রীয় মসজিদ থাকায় হলভিত্তিক পৃথক ইমামের প্রয়োজন নেই। তবে শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়।
এরপর দুই থেকে তিন মাসেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থীর স্বাক্ষরসহ আবার আবেদন করা হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসে ৫০ থেকে ১০০ টাকা সংগ্রহ করে ইমামের ব্যয় বহনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ইমামের আবাসনসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হয়।
এরই মধ্যে রুয়েট প্রশাসন তিনজন ইমাম ও দুজন মুয়াজ্জিন নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে প্রায় ৪০০ আবেদনকারীর মধ্য থেকে ৩০০ জনকে পরীক্ষা বা মৌখিক পরীক্ষার জন্য প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয় বলে শিক্ষার্থীরা জানান। তাঁদের অভিযোগ, আনুষ্ঠানিক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই একজনকে হঠাৎ হল মসজিদে ইমামের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বিষয়টি নিয়ে হল প্রশাসনের কাছে জানতে চাইলে শিক্ষার্থীদের জানানো হয়, নিয়োগের বিষয়টি তাঁদের আগে জানানো হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ওই ইমামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর বেতন ও আবাসন ব্যয় হলের ফান্ড থেকে বহনের নির্দেশনা রয়েছে। এতে নির্ধারিত নিয়োগপ্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কীভাবে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা।
দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই ইমামের কিরাত, তাজবিদ ও নামাজ-সংক্রান্ত বিভিন্ন মাসআলায় ভুল পরিলক্ষিত হয়েছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। এ নিয়ে আপত্তি ওঠার পর হল প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রাজশাহীর তালিমুদ্দীন একাডেমির দুই শিক্ষকের মাধ্যমে তাঁর ধর্মীয় জ্ঞানের মান যাচাই করা হয় বলে জানা গেছে।
শিক্ষার্থীদের দেওয়া মূল্যায়ন নথি অনুযায়ী, ১০০ নম্বরের ওই মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট ইমাম ৩১ নম্বর পেয়েছেন। এর মধ্যে কিরাতে ২৫ নম্বরের মধ্যে ১০, তাজবিদে ২৫ নম্বরের মধ্যে ৫ এবং মাসআলায় ৫০ নম্বরের মধ্যে ১৬ পেয়েছেন। মূল্যায়নের মুদ্রিত ও সফট কপি প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, যেখানে প্রায় ৩০০ প্রার্থীকে পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষার জন্য বাছাই করা হয়েছিল, সেখানে আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা শুরুর আগেই কী প্রক্রিয়ায় একজনকে ইমামের দায়িত্ব দেওয়া হলো। একই সঙ্গে নিয়োগের আগে তাঁর ধর্মীয় জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল, তা প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
নিয়োগসংক্রান্ত বিষয় ও হলের অন্যান্য অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে শিক্ষার্থীরা টানা দুই দিন উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করেন। তবে দ্বিতীয় দিন তাঁদের সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
এ বিষয়ে পুরকৌশল বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুস্তাফিজ বলেন, “আমরা ইমাম সাহেবের ভুল এবং নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে গত পাঁচ-ছয় মাসে দুবার উপাচার্যের কাছে, দুবার ছাত্রকল্যাণ দপ্তরে এবং পাঁচ-ছয়বার হল প্রভোস্টের কাছে গিয়েছি। ইমাম সাহেবের সঙ্গে বসেছি, শিক্ষার্থীদের মতামত নিয়েছি। এসবের পেছনে আমাদের সম্মিলিতভাবে এক হাজারের বেশি ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়েছে।”
অন্যদিকে, দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগও করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম সপ্তাহের পর থেকে সংশ্লিষ্ট ইমাম নিয়মিত আজান না দিয়ে শুধু নামাজের সময় হলে আসতেন। ফলে বিভিন্ন ওয়াক্তে শিক্ষার্থীদেরই আজান দিতে হয়েছে। কোনো কোনো ওয়াক্তে পূর্বঘোষণা ছাড়াই অনুপস্থিত থাকার পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার তিনি ছুটিতে থাকতেন বলেও অভিযোগ তাঁদের।
এ প্রসঙ্গে যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইকবাল বলেন, “এসব ছুটির সময়ে প্রক্সি ইমাম হিসেবে একজন হল শিক্ষার্থীর নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে হল প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হতো। প্রথম সপ্তাহে ওই শিক্ষার্থীর সম্মতি নেওয়া হলেও পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে তাঁর অজ্ঞাতসারেই নাম ও রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন ইমাম সাহেব।”
আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী সাজিদ বলেন, “ইমামের দায়িত্ব নেওয়ার শুরু থেকেই তাঁর ছেলেসহ হলে কক্ষ বরাদ্দ এবং হলের ডাইনিংয়ে বিনা মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। অথচ শিক্ষার্থীদের নিজস্ব অর্থায়নে ইমামের ব্যয় বহন এবং শুধু আবাসনের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে যে প্রক্রিয়ায় ইমাম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁর জন্য আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা কীভাবে করা হলো, সে বিষয়ে প্রশাসনের ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয়।”
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ইমামের হেফজ ও কারিয়ানা কোর্সের সনদ এবং তাঁর যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, যোগ্যতা ও সনদ যাচাইয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি কারিয়ানা কোর্স করার জন্য হল প্রশাসনের কাছে প্রায় এক মাসের ছুটির আবেদন করেন। এতে নিয়োগের আগে তাঁর যোগ্যতা ও সনদ যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে বলে জানান তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. আল-আমিন-আল-আজাদুল ইসলাম বলেন, “যে ব্যক্তিকে ইমামের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তিনি এখন হল মসজিদে নেই। তাঁকে ইমাম হিসেবে না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
শিক্ষার্থীদের মূল দাবি, ইমাম নিয়োগের প্রক্রিয়া, প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই, দায়িত্ব পালনে অনিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট ইমামের জন্য আবাসন ও খাবারের সুবিধা দেওয়ার বিষয়গুলো প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হোক। পাশাপাশি উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিকে স্থায়ী ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

Link copied!