বুধবার ২১, জানুয়ারি ২০২৬

বুধবার ২১, জানুয়ারি ২০২৬ -- : -- --

নির্ভরশীলতা নয়, সক্ষমতা তৈরি করা: টেকসই সমাজসেবার অগ্রযাত্রা

..

প্রকাশিত: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৩৮ পিএম

নাজমুল হাসান

নাজমুল হাসান

সেবা মানে শুধু সহানুভূতি নয়। সেবা মানে মানুষকে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার শক্তি জোগানো। সমাজে দুঃস্থ, দরিদ্র, অসহায়, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ আজও নানা কারণে পিছিয়ে আছে। এই পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ কেবল আর্থিক অভাব নয়, বরং সুযোগ, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তাদের অগ্রযাত্রাকে সবচেয়ে বড়ভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই সমাজসেবার প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন সহায়তা নিশ্চিত করা, যা মানুষকে বারবার সমাজ বা রাষ্ট্রের দিকে হাত বাড়াতে বাধ্য না করে। বরং নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে সম্মানের সঙ্গে জীবন পরিচালনার সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করা। প্রতি বছর ২ জানুয়ারি সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয় জাতীয় সমাজসেবা দিবস। এই দিবস আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর তাৎপর্য নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। দিবসটির প্রতিপাদ্য, “প্রযুক্তি ও মমতায়, কল্যাণ ও সমতায়, আস্থা আজ সমাজসেবায়” সময়োপযোগী এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এবারের আয়োজন একটি বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুজনিত কারণে দেশে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। তাই জাতীয় সমাজসেবা দিবস নির্ধারিত তারিখের পরিবর্তে ৩ জানুয়ারি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, নগর দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বার্ধক্যজনিত ঝুঁকি এবং প্রতিবন্ধিতা একত্রে সামাজিক সংকট বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। এই বাস্তবতায় সমাজসেবা কার্যক্রমকে কেবল সহানুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উদ্ভাবনী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান। দুঃস্থ, দরিদ্র, অসহায়, প্রতিবন্ধী এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কল্যাণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং সভ্য সমাজের নৈতিক কর্তব্য। সমাজসেবা রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মসূচিগুলো তারই বাস্তব প্রতিফলন। এই বছরের প্রতিপাদ্যে ‘প্রযুক্তি’ কেবল ডিজিটাল যন্ত্র নয়। এটি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সেবাপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করে। সরকারি পক্ষ থেকে সুবিধাভোগীর ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে সরাসরি পেমেন্ট পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা বিতরণে কার্যকারিতা বৃদ্ধি করছে। এটি দুর্নীতি কমাচ্ছে, সময় বাঁচাচ্ছে এবং মানুষের আস্থা শক্ত করছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে কোটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের ছোঁয়া পড়ছে। সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে, যেখানে জীবনচক্রভিত্তিক কর্মসূচিগুলো আরও সমন্বিত ও লক্ষ্যভিত্তিকভাবে কার্যকর করা হবে। এই ধাপে ত্রাণনির্ভরতার সংস্কৃতি থেকে সরে এসে অধিকারভিত্তিক এবং ক্ষমতায়নমুখী সমাজসেবার দিকে অগ্রসর হওয়ার বাস্তব সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করা সময়ের অন্যতম দাবি। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র এবং আশ্রয়ণ প্রকল্প-এসব কর্মসূচি কেবল আর্থিক সহায়তা নয়। বরং এগুলো মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তবে বাস্তবতা হলো, সমাজসেবা কেবল সরকারের একক প্রচেষ্টায় সফল হতে পারে না। রাষ্ট্রের শক্তির চেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। জনপ্রতিনিধি, সমাজকর্মী, বেসরকারি সংস্থা, তরুণ স্বেচ্ছাসেবক এবং সচেতন নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ কারণেই জাতীয় মানবকল্যাণ পদকের মতো স্বীকৃতি সমাজসেবায় যুক্ত মানুষদের অনুপ্রেরণা যোগায় এবং দায়িত্ববোধকে আরও দৃঢ় করে।

নির্ভরশীলতা নয়, সক্ষমতা তৈরির দর্শনকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সমাজসেবা কার্যক্রমকে কেবল ভাতা বা সহায়তা প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযুক্ত করা জরুরি। সরকারের উচিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা গড়ে তোলা এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নগর দরিদ্র, তরুণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা এবং স্টার্টআপ বা উদ্যোক্তা হিসেবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে তারা সহায়তার গ্রহীতা নয়, বরং অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদারে পরিণত হতে পারবে। একই সঙ্গে শিক্ষা, শিল্প ও সমাজসেবা খাতের সমন্বয়ের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে বেকারত্ব হ্রাস পাবে এবং সমাজসেবা ধীরে ধীরে নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি ভেঙে সক্ষমতা-নির্ভর টেকসই উন্নয়নের পথে অগ্রসর হবে।

স্থানীয় সরকার, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সমন্বয় টেকসই সমাজসেবার অন্যতম মূল ভিত্তি। স্থানীয় সরকারের নেতৃত্বে এলাকাভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হলে যুবসমাজ সহজেই কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে বেকারত্ব কমে এবং মানুষ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজ সক্ষমতায় স্বাবলম্বী হয়। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও ওয়ার্ডভিত্তিক সমাজসেবা কার্যক্রম শক্তিশালী হলে জাতীয় নীতি ও পরিকল্পনার সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কার্যকর সংযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর সমাজসেবায় ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য ও মানবিক প্রযুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি। সমাজসেবার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কেবল সহায়তার ভোক্তা নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবাকে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তরুণ সমাজের অংশগ্রহণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। এভাবেই নির্ভরশীলতা নয়, সক্ষমতা তৈরির মাধ্যমে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজসেবার বাস্তব অগ্রযাত্রা সম্ভব।

সমাজসেবার দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রের একার নয়। সমাজের বিত্তবান মানুষ, উদ্যোক্তা, পেশাজীবী ও সামাজিক কাজে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের উচিত মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে আসা। দান বা অনুদানের পাশাপাশি এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা পিছিয়ে থাকা মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করে তুলতে পারে। শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ মানুষের জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে। প্রকৃত সমাজসেবা সেটিই, যা মানুষকে নির্ভরশীল করে না, বরং সক্ষমতা তৈরি করে। তরুণরাই সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের অন্যতম দায়িত্ব হলো সমাজের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং তাৎক্ষণিক ও কার্যকর সমাধান আনার কাজে যুক্ত থাকা। যেসব সমাজসেবামূলক উদ্যোগ কেবল ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীর তাৎক্ষণিক উপকারে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সমাজের মূল সমস্যার সমাধানেও অবদান রাখে, সেগুলোই দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই সুফল প্রদান করে।

পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি এবং সামাজিক সচেতনতার মতো ক্ষেত্রে তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা ও স্বেচ্ছাশ্রম সমাজকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে পারে। আজ প্রয়োজন এমন সমাজসেবা, যা মাত্র আবেগের ওপর সীমাবদ্ধ নয়। বরং চিন্তাশীল পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল কর্মের মাধ্যমে ব্যক্তি এবং সমাজকে একসাথে আলোকিত করে। জাতীয় সমাজসেবা দিবস আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়, উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো গড়ার বিষয় নয়। উন্নয়ন মানে মানুষকে এগিয়ে নেওয়া এবং তাদের জীবন মানোন্নয়ন করা। প্রযুক্তি ও মমতার সমন্বয়ে যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে সত্যিই এমন একটি বাংলাদেশ গড়া সম্ভব, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না।

সমাজসেবা হলো সমাজের অন্ধকারে আলোর প্রদীপ, যা মানুষের জীবনে নতুন আশা জ্বালায়। প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপ সেই আলোকে আরও শক্তিশালী ও সুদূরপ্রসারী করুক, এটাই জাতীয় সমাজসেবা দিবসের প্রত্যাশা।

লেখকঃ

নাজমুল হাসান (পিআরএস, উডব্যাজার) ।রোভার স্কাউট লিডার।ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এয়ার রোভার স্কাউট গ্রুপ, ঢাকা।
ই-মেইলঃ nazmul33-3424@diu.edu.bd 

Link copied!