বুধবার ১১, মার্চ ২০২৬

বুধবার ১১, মার্চ ২০২৬ -- : -- --

নারী সমাজের আহাজারি, এই প্রহসনের বিচার ব্যবস্থায় ধর্ষিতা কি বিচার পাবে? 

আব্দুল্লাহ আর রাফি,গোবিপ্রবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম

ফাইল ফটো

দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ধর্ষণের ঘটনা। বয়স্ক থেকে শুরু করে শিশুরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। বিচারের ধীরগতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়া ও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। এই বিচারহীনতা কি আমাদের মব জাস্টিসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? বিচার না পেতে পেতে নির্যাতিত নারী সমাজ এবং নারীবাদী জনগোষ্ঠী যে কিছুদিন পর গর্জে উঠবে না , আইন নিজের হাতে তুলে নেবে না তার গ্যারান্টি কি? ভয়ে সন্ত্রস্ত মানুষ কিন্তু ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে! নারীজাতিকে নৃশংসতার করাঘাতে আতঙ্কিত করতে করতে আমরা কি ধীরে ধীরে এক ভয়ংকর মব এর জন্ম দিচ্ছি? 

বর্তমানে নারী ও শিশু ধর্ষণের মাত্রা এত বেড়েছে যে পত্রিকার পাতা খুলতেই ফ্রন্ট পেজে একের পর এক ধর্ষনের ঘটনা।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকা থেকে অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয় । পুলিশ জানিয়েছে, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর কিশোরীকে হত্যা করে লাশ ফেলে দেওয়া হয়।

ঝিনাইদহে চার বছরের শিশুকন্যা তাবাসসুমকে ধর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে ৩০ বছরের এক যুবক তাকে হত্যা করে ট্যাংকির মধ্যে ফেলে দেয়।

ছয় বছর বয়সী তাহেদী আক্তার নামে এক শিশুর মরদেহ ঢাকার হাতিরঝিলের পশ্চিম উলান এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনে উদ্ধার করা হয়।

এছাড়াও পাবনার ঈশ্বরদীতে মধ্যরাতে বাড়িতে ঢুকে দাদিকে হত্যা এবং নাতনিকে অপহরণের পর ধর্ষণ করে হত্যার অভিযোগে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। নিহত দাদীর লাশ বাড়ির উঠানে পড়েছিল এবং ভিকটিমের লাশ পাওয়া যায় বাড়ির পাশে সরিষা খেতে বিবস্ত্র অবস্থায়। একবার চিন্তা করেছেন কি জঘন্য নৃশংসতা! এটা কি কোন সভ্য সমাজের চিত্র? কোন অন্ধকার যুগে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা। যেখানে বাড়িতেও নারী নিরাপদ নয়। 

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন এক ধরনের সহিংসতা দেখা দিয়েছে ,সাইবার সহিংসতা। অনলাইন হয়রানি, ছবি বিকৃতি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং অনলাইন হুমকি বেড়েছে।

তাছাড়া বর্তমানে ধর্ষণের আরেকটি মডারেটর রূপ বের হয়েছে। "রিলেশনশিপ" নামক হেতুর দোহাই দিয়ে নারীদেরকে বিভিন্নভাবে প্রতারিত করে ধর্ষণ করা হয়।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রদত্ত তথ্য মতে, জানুয়ারিতে ঢাকাসহ সারাদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩১টি। মোট আক্রান্তদের মধ্যে ২৫ জন একক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ১০ জন দলগত ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।ধর্ষণের পর দুজন ভুক্তভোগীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং একজন ধর্ষণের গ্লানি সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। 

মোট ৩৫টি ঘটনার মধ্যে ২৮টি ঘটনায় মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়েছে, তবে পাঁচটি ঘটনার ক্ষেত্রে মামলা দায়ের সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১২ বছর বা তার কম বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যেখানে ৬ বছরের নিচে ২ জন এবং ৭ থেকে ১২ বছর বয়সি ১১ জন শিশু এই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে। এছাড়া ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি ৩ জন, ১৯ থেকে ২৪ বছর বয়সি ২ জন, ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সি ২ জন এবং ৩০ বছরের ঊর্ধ্বে দুজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। 

এই নৃশংসতার কারণ কি আইনের অপর্যাপ্ততা? বাস্তবিক অর্থে বাংলাদেশে নারীর প্রতি নৃশংসতা দমনে পর্যাপ্ত আইন রয়েছে।নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং ২০২০ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে।গার্হস্থ্য সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০; এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা নারীদের সুরক্ষার জন্য বিদ্যমান। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনায় নারী, শিশু ও কিশোরী সহায়তা ডেস্ক চালু হয়েছে বহু থানায়। পাশাপাশি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এবং ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মতো সেবাও রয়েছে। তবে আইনের কঠোরতা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ সত্ত্বেও কেন অপরাধ কমছে না?

কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও এর দুর্বল প্রয়োগ ও দীর্ঘসূত্র বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে অপরাধীরা শাস্তির ভয় পায় না। সামাজিক লজ্জা ও ভিকটিম ব্লেমিংয়ের কারণে অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ দায়ের করতে সাহস পান না। অনেক সময় যৌন সহিংসতার শিকার নারী বা শিশুর পোশাক, চলাফেরা, সময় বা আচরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। এর ফলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার সামাজিক লজ্জা ও চাপের মুখে পড়ে এবং অনেকেই মামলা করতে নিরুৎসাহিত হয়।

এছাড়া বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়া খুবই ধীর। আদালতের মামলা শেষ হতে প্রায়ই বছরের পর বছর লেগে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে ভুক্তভোগীরা সামাজিক কলঙ্ক, মানসিক চাপ এবং আর্থিক সমস্যায় ভোগেন।

আর গ্রামীণ এলাকায় নারী নির্যাতনের অধিকাংশ ঘটনাই অনানুষ্ঠানিক গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। অনেক সময় সালিশের নামে ভুক্তভোগীদের ওপর অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের মতামত উপেক্ষা করা হয়।

তাছাড়া প্রমাণ সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা ও তদন্তের ত্রুটিও অনেক মামলাকে দুর্বল করে দেয়। পাশাপাশি নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক মানসিকতা ও সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি এই অপরাধ কমাতে বড় বাধা হয়ে আছে।

এই সমস্যার সমাধানে আইনের প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। তবে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বর্তমান ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে। শুধু ধর্ষণ মামলার বিচার পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে এবং সেখানে নারী বিচারক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে, যাতে তারা নারীদের অনুভূতি ভালোভাবে বুঝতে পারেন এবং মামলার সাক্ষী ও ভুক্তভোগীরা আদালতের সামনে কোনো ধরনের সংকোচ বোধ না করেন। বর্তমানে বিচারাধীন ধর্ষণ মামলাগুলো ওই বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ধর্ষকদের মধ্যে একটি কার্যকর ভীতি (deterrence) সৃষ্টি হবে। এতে আশা করা যায়, ধর্ষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

এছাড়া সমতা ও মানবাধিকার বিষয়ে শিক্ষাকে জোরদার করতে হবে। সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন ছাড়া শুধু আইন দিয়ে বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

সরকার এবং প্রশাসনের এ বিষয়টির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেওয়া উচিত।নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক, নতুন সরকারের নেতৃত্বে জনগণ স্বপ্ন দেখে এমন এক বাংলাদেশে যেখানে নারীরা থাকবে নিরাপদে এবং নির্ভয়ে!

 

নায়িমা আখতার

আইনবিভাগ,

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Link copied!