প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৬ পিএম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আলাওল হলে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে হল প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবি জানিয়ে হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এবং হল সংসদের নেতৃত্বরা প্রভোস্টকে কর্মরত অবস্থায় কার্যালয়ের ভিতরে রেখেই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে প্রায় আড়াই ঘন্টা অবরুদ্ধ করে রাখে।
১৫ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) দুপুর ১টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাওল হলে অবস্থানরত উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এবং সংসদের প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে হলটির প্রভোস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক জমালুল আকবর চৌধুরীকে নিজ কার্যালয়ে রেখে তালা দাওয়া হয়, একই সাথে হলের অফিস কক্ষে তালা দেওয়া হলেও কিছুক্ষণের মধ্যে তা খুলে দেয় আন্দোলনকারীরা। কিন্তু প্রায় আড়াই ঘন্টা অবরুদ্ধ থাকার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সহযোগিতায় উদ্ধার হন আতঙ্কগ্রস্থ ঐ শিক্ষক। উদ্ধার কালীন সময়েও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দ্বারা লাঞ্ছনার শিকার হন ভুক্তভোগী ঐ শিক্ষক।
হল সংসদের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা, হল সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, উন্নয়নমূলক কাজে দীর্ঘসূত্রিতা এবং দীর্ঘদিন ধরে আসন বণ্টনে অব্যবস্থাপনা ও আসন বণ্টনে অস্বচ্ছতা সহ একাধিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল আলাওল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক জমালুল আকবর চৌধুরীর পদত্যাগ।
তবে, ফ্যাসিবাদ বিরোধী চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে সক্রিয় থাকা অধ্যাপক জমালুল আকবর চৌধুরী ‘মব কালচারের’ মাধ্যমে হেয়প্রতিপন্ন ও সম্মানহানি করার অভিযোগ তুলে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিকট এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সকল নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার পর, নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এক ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, পূর্বে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১৬ দিনের মাথায় হল সংসদের নামে তার কক্ষে তালা ঝুলানো হয়েছিল। এ ঘটনায় প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যে ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের অধিকার ও কল্যাণের প্রতিনিধিত্ব করার কথা, তাদের এমন আচরণ কতটা ছাত্রবান্ধব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, হলের সিসিটিভি চালু না করা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটি বর্তমানে তদন্তাধীন। বিল নির্ধারিত বা স্বাভাবিক ব্যয়ের তুলনায় বেশি হয়ে থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করেই তা পরিশোধ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। এছাড়া হলের প্রবেশমুখে প্রক্টর অফিস থেকে দেওয়া তিনটি ক্যামেরা বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে বলেও জানান।
পানির বিল ও পানির মান পরীক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, হল সংসদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরবরাহকৃত পানি পরীক্ষার জন্য চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার প্রতিবেদন পেতে বিলম্ব হলেও বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তিনি নিয়মিত তাগাদা দিয়ে আসছেন বলে দাবি করেন।
হলের সিট বরাদ্দের বিষয়ে প্রভোস্ট জানান, আইসিটি সেল থেকে বরাদ্দ দেওয়া ১৪টি সিটের প্রক্রিয়ায় তার কোনো ভূমিকা বা ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ ছিল না। প্রভোস্ট কোটায় তিনি মাত্র একটি সিট বরাদ্দ দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও জানান তিনি। উল্লেখ্য, হলটিতে অনিয়মতান্ত্রিক সিট বন্টন ও সিট দখলের সমস্যা তার প্রভোস্টের দায়িত্ব পাওয়ার পূর্বে থেকেই বিদ্যমান ছিল।
হলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে প্রভোস্ট বলেন, কর্মকর্তা সৈয়দ হোসেনের দায়িত্ব পালনে অনিয়ম ও হল অফিসকে অবহিত না করে ছুটি নেওয়ার বিষয়ে তিনি রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিতভাবে জানিয়েছেন। এছাড়া হলের বিভিন্ন স্থাপনা ও সংস্কারকাজের একজন ঠিকাদারকে যাচাই-বাছাই ছাড়া অতিরিক্ত বিল দেওয়ার জন্য কর্মকর্তা সৈয়দ হোসেন ও কেয়ারটেকার সালাউদ্দিন লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। এ কারণে অতিরিক্ত বিল দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং এ সংক্রান্ত কাগজপত্রও তার কাছে রয়েছে বলে জানান। যার দরুন, উন্নয়নমূলক কাজে দীর্ঘসূত্রিতার কিছুটা সৃষ্টি হয়েছে।
প্রভোস্ট আরও বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ অফিসে প্রবেশের পর দায়িত্বের সময় শেষ হওয়ার আগেই অফিসকে না জানিয়ে চলে যান। হলের সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করলে এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে বলেও দাবি করেন তিনি।
রাতে হলে অবস্থান ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি বলেন, উপাচার্যের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রভোস্ট ও আবাসিক শিক্ষকদের সন্ধ্যাকালীন দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে তিনি সোম ও মঙ্গলবার হলে দায়িত্ব পালন করেন। এটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী পালন করা দায়িত্ব।
দায়িত্ব গ্রহণের পর গত চার মাসে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বিবেচনায় খাট, চেয়ার-টেবিল, ল্যাম্প, রান্নাঘরের বিভিন্ন তৈজসপত্র ও প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী কেনার ব্যবস্থা করেছেন বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি দুটি গেমসের আয়োজন করার কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, কোনো বিষয় সরেজমিনে না দেখে কিংবা প্রকৃত তথ্য যাচাই না করে শুধু কারও বক্তব্যের ভিত্তিতে কোনো নথিতে স্বাক্ষর করা একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার দায়িত্ববোধ তাকে এমন কাজ করতে দেয় না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সবশেষে প্রভোস্ট বলেন, তিনি অন্যায় করলে জবাবদিহি করতে প্রস্তুত। তবে যে অন্যায় তিনি করেননি, তার দায়ও যেন তার ওপর চাপানো না হয়, এটাই তার প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনিক কাজে দায়িত্ব পালনরত একজন শিক্ষককে মব কালচারের মাধ্যমে অযথা সম্মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করার ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। এ ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধে প্রশাসনের যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মব কালচারের মাধ্যমে হয়রানি বা সম্মানহানির শিকার হতে না হয়, সে জন্য একটি সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সব নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সবার সামনে স্পষ্ট হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবির বিষয় আলাওল হল সংসদের জিএস নূরনবী গণমাধ্যমকে জানান, আমরা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি। তাদের কল্যাণেই আমাদের কাজ করতে হয়। হল প্রভোস্টের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নানা অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা তার পদত্যাগ চান।
