বুধবার ১১, মার্চ ২০২৬

বুধবার ১১, মার্চ ২০২৬ -- : -- --

নারী শিক্ষার নীরব বিপ্লবের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

..

প্রকাশিত: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:১৭ পিএম

অধ্যাপক মো: ওয়াকিলুর রহমান

অধ্যাপক মো: ওয়াকিলুর রহমান।

“আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব”- এই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উক্তিটি করেছিলেন ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। একটি জাতির মানবসম্পদ উন্নয়নে নারী শিক্ষার গুরুত্ব তিনি বহু আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। তবে আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষিত মা গড়ে তোলা মোটেই সহজ কাজ ছিল না।

স্বাধীনতার পর কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় নারী শিক্ষাকে অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। আশির দশক পর্যন্ত মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ ছিল সীমিত এবং অনিশ্চিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের নিট ভর্তি হার ছিল মাত্র ২৫-৩০ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের হার ছিল প্রায় ৪৫ শতাংশের বেশি। একই সময়ে মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৬৫ শতাংশে। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, সামাজিক কুসংস্কার, নিরাপত্তাহীনতা এবং অল্প বয়সে বিয়ের প্রবণতা - সব মিলিয়ে নারী শিক্ষা ছিল এক প্রকার সামাজিক বিলাসিতা, অধিকার নয়।

উল্লেখ্য যে, মহিয়ষী নারী বেগম রোকেয়া এক শতাব্দী আগেই নারী শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুসংহত নীতিগত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিবর্তন টেকসই হওয়া সম্ভব ছিল না। আর সেই প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ আসে নব্বইয়ের দশকে।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের জন্য বিনা বেতনে শিক্ষা ও উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু করা হয়। এটি ছিল একটি সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো স্পষ্ট বার্তা দেয়, মেয়েদের শিক্ষা কেবল সামাজিক উন্নয়নের অংশ নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের কৌশল।

এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ছিল স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিবিএস (BBS) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের মধ্যেই মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভর্তি হার বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ শতাংশে। পরবর্তী এক দশকে এই হার ছেলেদের হারকে অতিক্রম করে। বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ সালের তথ্য মতে সামগ্রিক (gross) সেকেন্ডারি পর্যায়ে মেয়েদের বর্তমানে ভর্তি হার ৮১.১৪ শতাংশ, অন্যদিকে ছেলেদের হার ৬৫.১৫ শতাংশ। এইচ.এস.সি পর্যায়ে তা নেমে মেয়েদের হার ৫৫.২৩ শতাংশ এবং ছেলেদের হার ৪৯.৮৩ শতাংশ। এমনকি ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। একই উৎস মতে, ঝরে পড়ার হার প্রাইমারি পর্যায়ে মেয়েদের সংখ্যা ১২.১৭ শতাংশ এবং ছেলেদের হার একটু বেশি ১৪.০৯ শতাংশ। এখন শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় পরিবারগুলো মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়েছে, কারণ শিক্ষা আর্থিক বোঝা না হয়ে সম্ভাবনায় রূপ নিয়েছে।

তবে এই অগ্রগতির প্রতিফলন সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায় পরীক্ষার ফলাফলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এস.এস.সি পরীক্ষায় মেয়েদের পাশের হার গড়ে ৭৫-৭৮ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের পাশের হার ৭০-৭২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এইচ.এস.সি পরীক্ষাতেও ভালো ফলাফলের দিক থেকে মেয়েরা এগিয়ে। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের অংশগ্রহণ এখন প্রায় ৫৫ শতাংশের কাছাকাছি। আনন্দের বিষয় হলো, মেয়েরা কিন্তু এখানেই থেমে থাকছে না; তাদের উচ্চ শিক্ষায় অংশগ্রহণ দিন দিন বেড়েই চলছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে একটি আশাব্যঞ্জক চিত্র। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৫২-৫৪ শতাংশই নারী। একসময় ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলো পুরুষপ্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হলেও আজ সেই ধারণা ভেঙে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জিং ও কারিগরি শিক্ষাক্ষেত্রেও মেয়েরা এখন কেবল অংশগ্রহণই নয়, বরং ফলাফল ও সাফল্যের দিক থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৫১ শতাংশই ছিল নারী - যা দেশের উচ্চশিক্ষায় নারী অগ্রগতির এক তাৎপর্যপূর্ণ সূচক।

নারী শিক্ষায় এই দৃশ্যমান অগ্রগতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং নব্বইয়ের দশকে গৃহীত নীতিগত উদ্যোগ ও সামাজিক সচেতনতার দীর্ঘমেয়াদি ফল। সে সময় নেওয়া পদক্ষেপগুলো আজ বাংলাদেশের নারী শিক্ষায় এক নীরব বিপ্লবের রূপ নিয়েছে। আজকের শিক্ষিত মেয়েরাই আগামী দিনের শিক্ষিত মা, দক্ষ মানবসম্পদ ও দায়িত্বশীল নাগরিক। সুতরাং নারী শিক্ষায় বিনিয়োগ মানে কেবল একটি প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়া নয় - এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে সুদূরপ্রসারী বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে নারী শিক্ষার এই অগ্রযাত্রা নিঃসন্দেহে একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। তবে এই অর্জনকে টেকসই করতে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার - তিন স্তরেই দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত রাখতে হবে। এখন সময় এসেছে শিক্ষিত নারীদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, এবং নেতৃত্বের সুযোগ নিশ্চিত করার। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে তারা কেবল শিক্ষায় নয়, দেশের প্রগতিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে। সুতরাং আগামী নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব হবে কেবল সংখ্যাগত অগ্রগতি নয়, বরং শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং নারীদের জন্য কর্মসংস্থান ও কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা - যা জাতির সমৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের দিক থেকে অপরিহার্য।

অধ্যাপক মো: ওয়াকিলুর রহমান।   গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

Link copied!