প্রকাশিত: ০৩ জুন ২০২৬, ০৯:১১ এএম
যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইকে ঘিরে নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলা, ব্যবহারকারীদের মধ্যে আসক্তি তৈরি করা এবং জননিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি সৃষ্টি করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য।
মামলায় শুধু ওপেনএআই নয়, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ঘটনাকে এআই প্রযুক্তির জবাবদিহি নিয়ে চলমান বৈশ্বিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমিয়ার দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ওপেনএআই এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান জননিরাপত্তার চেয়ে ব্যবসায়িক লাভকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। মামলায় দাবি করা হয়, তাদের এআই প্রযুক্তি শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, ব্যবহারকারীদের মধ্যে আসক্তি তৈরি করছে, এমনকি সহিংস অপরাধ ও আত্মহত্যামূলক আচরণকে উৎসাহিত করার আশঙ্কাও তৈরি করছে।
মামলায় স্যাম অল্টম্যানকে ব্যক্তিগতভাবেও দায়ী করার আহ্বান জানানো হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তার নেতৃত্বে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম মানুষের জীবনের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি সৃষ্টি করলেও তিনি সেই বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দেননি।
ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক ও অন্যায্য ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, অবহেলা, পণ্যের দায়বদ্ধতা আইন লঙ্ঘন এবং জনস্বার্থবিরোধী পরিস্থিতি তৈরির মতো একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে।
সহিংস ঘটনার প্রসঙ্গ টানা হয়েছে মামলায়
গত বছর ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সংঘটিত বন্দুক হামলায় দুজন নিহত হওয়ার ঘটনাও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনায় চ্যাটজিপিটির কোনো ধরনের ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ পৃথকভাবে ফৌজদারি তদন্ত চালাচ্ছে। এ ছাড়া ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও মামলার নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রসিকিউটরদের দাবি, ওই মামলার সন্দেহভাজন ব্যক্তি মানবদেহ গোপন করার উপায় সম্পর্কে চ্যাটজিপিটির কাছে তথ্য জানতে চেয়েছিলেন।
এক সংবাদ সম্মেলনে জেমস উথমিয়ার বলেন, স্যাম অল্টম্যান ও তার প্রতিষ্ঠান শিশুদের নিরাপত্তার চেয়ে এআই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের কাছে জননিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাই অগ্রাধিকার পেয়েছে। এজন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ওপেনএআইয়ের প্রতিক্রিয়া
মামলার জবাবে ওপেনএআই জানিয়েছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষাকে তারা শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে আসছে এবং এআই খাতে অন্যতম শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো অনুসরণ করছে।
প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেন, সন্তানের মৃত্যু কোনো পরিবারের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। এ ধরনের ক্ষতির জন্য কোনো ভাষাই যথেষ্ট নয়। তিনি জানান, নাবালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বয়স যাচাই প্রযুক্তি এবং অভিভাবকদের জন্য পর্যবেক্ষণ সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইনি চ্যালেঞ্জ
শুধু ফ্লোরিডার মামলাই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেও আইনি চাপের মুখে রয়েছে ওপেনএআই। একাধিক মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর মানসিক অবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং আত্মহত্যা-সংক্রান্ত চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করেছে।
চলতি বছরের শুরুতে কানাডার টাম্বলার রিজে সংঘটিত বন্দুক হামলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি পরিবারও ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ব্যক্তির অ্যাকাউন্টকে ‘সমস্যাজনক ব্যবহার’-এর কারণে প্রতিষ্ঠানটি নিষিদ্ধ করলেও বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানায়নি। পরে এ বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ না করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ওপেনএআই।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও বাড়ছে মামলা
কেবল ওপেনএআই নয়, অন্যান্য প্রযুক্তি জায়ান্টও বর্তমানে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ফ্লোরিডার এক ব্যক্তি গুগলের বিরুদ্ধে মামলা করে অভিযোগ করেছেন, প্রতিষ্ঠানটির এআইভিত্তিক সেবার কারণে বিভ্রান্ত হয়ে তার ছেলে আত্মহত্যা করেছে।
অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেটা, স্ন্যাপ, টিকটক এবং ইউটিউবও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করা মামলার মুখোমুখি। এসব মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবে আসক্তিমূলক বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
