সানজানা শওকত,বুটেক্স প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০১ মে ২০২৬, ০৭:৫৮ পিএম
শনিবার ০২, মে ২০২৬ -- : -- --
বুটেক্স। ছবি: ক্যাম্পাস রিপোর্ট
সকাল তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। ক্যাম্পাসের গাছপালায় পাখির ডাক, ফাঁকা করিডোর আর নিস্তব্ধ একাডেমিক ভবনের ভেতরেই শুরু হয়ে যায় একদল মানুষের নীরব কর্মযজ্ঞ। কেউ ঝাড়ু হাতে পরিষ্কার করছেন, কেউ ড্রেন পরিষ্কারের কাজে ব্যস্ত, আবার কেউ গেটের পাশে দাঁড়িয়ে নিচ্ছেন নিরাপত্তার দায়িত্ব। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও প্রতিদিনের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ছন্দ ঠিক রাখেন তারাই।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের পেছনে রয়েছে এই অদৃশ্য শ্রম। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা প্রতিদিন ক্যাম্পাসকে রাখেন বাসযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন। নিরাপত্তা প্রহরীরা দিন-রাত পালা করে দায়িত্ব পালন করেন, নিশ্চিত করেন ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা। হলগুলোতে কাজ করা সহায়ক কর্মীরাও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
তবে এই নিরব শ্রমের বাস্তবতা অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়। ন্যায্য পারিশ্রমিক, কর্মপরিবেশ এবং জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের রয়েছে নানা অনিশ্চয়তা ও প্রত্যাশা।
অফিস সহায়ক ও নিরাপত্তা প্রহরী নিতাই দত্ত বলেন, “আমি ২৭ বছর ধরে এখানে চাকরি করছি। ঝড়-বৃষ্টি হোক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় খোলা বা বন্ধ- যে পরিস্থিতিই থাকুক না কেন, আমাদের দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়। দিন-রাত কোনো পার্থক্য থাকে না। সরকারি বেতনে কোনোভাবে সংসার চললেও মাঝে মাঝে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। কিন্তু সেই ওভারটাইমের পারিশ্রমিক ঘণ্টায় মাত্র ২০ টাকা, যা বর্তমান সময়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। তবে কাজ করতে গিয়েই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমাদের এক আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তারা আমাদের কাছে পরিবারের সদস্যদের মতো হয়ে যায়।”
ক্যাম্পাসের আবাসিক হলগুলোতেও এই নিরব শ্রম দৃশ্যমান। খাবার পরিবেশন থেকে শুরু করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও বিভিন্ন সেবামূলক কাজে নিয়োজিত কর্মীরা শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রাকে সহজ করে তোলেন। কিন্তু তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে সীমিত বেতনে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম হলের পরিচ্ছন্নতা কর্মী মো. হুমায়ুন কবির বলেন, “আমাদের হলের অনেক স্টাফ ১০, ১২ এমনকি ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন। কিন্তু যারা ৪০০০, ৫০০০ বা ৬০০০ টাকার মতো কম বেতনে চাকরি করছেন, তাদের জন্য সংসার চালানো খুবই কষ্টকর হয়ে যায়। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, হল স্টাফদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হোক।”
তিনি আরও বলেন, মাঝে মাঝে আমাদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়, কিন্তু সেই অনুযায়ী ওভারটাইম ভাতা আমরা পাই না। তবে হলের শিক্ষার্থীরা আমাদের প্রতি অনেক সহযোগিতাপূর্ণ। যেকোনো বিপদে তারা আমাদের পাশে দাঁড়ায়, এমনকি কোনো খাবারের আয়োজন করলে সেখানে আমাদেরও অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে তাদের সঙ্গে আমাদের একটি ভিন্নধর্মী, আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।”
জিএমএজি ওসমানী হলের নিরাপত্তা প্রহরী মো. শফিকুল বলেন, “আমরা যে বেতন পাই, চারটি সন্তান নিয়ে বর্তমান বাজারে সংসার চালানো খুবই কষ্টকর। আমাদের বেতন আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয়, ফলে আমরা কোনো ঈদ বোনাস বা বৈশাখী বোনাস পাই না। তবুও শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিকতা থেকেই আমরা দিন-রাত কাজ করে যাই। তাদের চলাফেরা, খেলাধুলা ও ক্যাম্পাসের প্রাণচাঞ্চল্য আমাদের সব দুঃখ-কষ্ট অনেকটাই ভুলিয়ে দেয়।”
প্রতিবছর মহান শ্রমিক দিবস শ্রমের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ এনে দেয়। কিন্তু বুটেক্সের এই নীরব কর্মীদের জন্য দিনটি কেবল প্রতীকী হয়ে থাকলে বাস্তব পরিবর্তনের প্রশ্ন থেকেই যায়। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক স্বীকৃতি তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা।
দিন শেষে এই নীরব শ্রমিকদের হাতেই দাঁড়িয়ে থাকে বুটেক্সের প্রতিদিনের জীবনচক্র- শিক্ষা, গবেষণা ও আবাসিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য ছন্দ।