প্রকাশিত: ০১ মে ২০২৬, ০৮:৪৬ এএম
প্রতি বছর ১ মে আসে। মিছিল হয়, স্লোগান ওঠে, সরকারি ছুটি থাকে। পত্রিকায় বড় হরফে লেখা হয় "শ্রমিক দিবসে শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধা।" কিন্তু সেই শ্রমিক, যার হাতের ঘামে এই দেশের অর্থনীতি টিকে আছে সে কি জানে এই দিনটা কেন পালন হয়? সে কি জানে ১৮৮৬ সালের শিকাগোতে তার পূর্বপুরুষেরা রক্ত দিয়েছিল শুধু আট ঘন্টা কাজের অধিকারের জন্য? মে দিবস নিয়ে লিখেছেন,গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র মোঃ তায়ীম খান।
রক্তের দামে কেনা দিন
১৮৮৬ সালের ১ মে। আমেরিকার শিকাগো শহর। হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমেছে একটাই দাবিতে দিনে আট ঘন্টার বেশি কাজ নয়। তখন কারখানায় শ্রমিকদের ১২ থেকে ১৬ ঘন্টা খাটানো হতো, মজুরি ছিল নামমাত্র। হেমার্কেট স্কোয়ারে সেই আন্দোলনে গুলি চলল, বোমা ফাটল। অনেক শ্রমিক প্রাণ হারালেন। কিন্তু সেই রক্তই একদিন বদলে দিল ইতিহাসের গতিপথ। ১৮৮৯ সালে আন্তর্জাতিকভাবে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেল।
প্রশ্ন হলো যে অধিকারের জন্য এত রক্ত ঝরেছিল, সেই অধিকার কি আজ পূর্ণ হয়েছে?
বাংলাদেশের শ্রমিক: মাঠের ছবি
বাংলাদেশে কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ আছেন। কৃষক, রিকশাচালক, ইটভাটার শ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, গৃহকর্মী এরা দেশের মেরুদণ্ড। কিন্তু তাদের জীবনের দিকে তাকালে চোখ ভিজে আসে। সকাল থেকে রাত পরিশ্রম করেন, তবু মাস শেষে হাতে যা থাকে তা দিয়ে সংসার চলে না। সামাজিক নিরাপত্তা নেই, কাজের চুক্তি নেই, অসুস্থ হলে চিকিৎসার সুযোগ নেই। গৃহকর্মীদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ তাদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আইনি সুরক্ষা কাঠামোই নেই।
সবচেয়ে কষ্টের কথা হলো এই শ্রমিকদের বড় একটা অংশ এখনো জানেন না তাদের আইনি অধিকার কী।
পোশাক শিল্প: গর্বের আড়ালে গ্লানি
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ জোগান দেয়। এই শিল্পে কাজ করেন ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক, যাদের অধিকাংশই নারী। বিশ্বের বড় বড় ব্যান্ডের পোশাক এই মেয়েদের হাতে তৈরি হয়। অথচ তাদের জীবন কতটা নিরাপদ?
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল। সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়ল। ১,১৩৪ জন শ্রমিক সেদিন প্রাণ হারালেন যাদের বেশিরভাগ ছিলেন তরুণী। আগের দিন ভবনে ফাটল দেখা গিয়েছিল, ব্যাংক ও দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গার্মেন্টস মালিকেরা শ্রমিকদের কাজে আসতে বাধ্য করেছিলেন মজুরি কাটার ভয় দেখিয়ে। পরদিন ১ মে, শ্রমিক দিবসে, হাজার হাজার শ্রমিক ঢাকার রাজপথে নেমে দাবি করেছিলেন নিরাপদ কর্মপরিবেশ আর মালিকের সর্বোচ্চ শাস্তির। সেই ক্ষতের দাগ আজো শুকায়নি।
ন্যূনতম মজুরি: হিসাবের ফাঁদ
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে যা ২০২৫ সালেও অপরিবর্তিত। কাগজে-কলমে বাড়লেও বাস্তবে এই মজুরি দিয়ে ঢাকায় একটা পরিবার চালানো রীতিমতো যুদ্ধ। শ্রমিক ইউনিয়নগুলো বলছে জীবনধারণের জন্য কমপক্ষে ২৩,০০০ টাকা দরকার। আর সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা সবচেয়ে কম।
এই মজুরি বাড়ানোর দাবিতে ২০২৩ সালে শ্রমিকেরা রাস্তায় নামলেন। পুলিশের সাথে সংঘর্ষে দুইজন শ্রমিক প্রাণ হারালেন। তারপরও যা পেলেন, তা দিয়ে বাজারের সাথে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন শ্রমিক নেতারা। কৃষি, নির্মাণ ও গৃহকর্মী শ্রমিকদের জন্য কোনো মজুরি কাঠামোই নেই।
উৎসব এলে কোথায় যায় শ্রমিক?
ঈদের আগে দেখা যায় সবচেয়ে করুণ ছবিটা। কারখানায় অতিরিক্ত কাজ করানো হয়, রাত জেগে অর্ডার শেষ করতে হয়। আর ঈদ বোনাস? সেটা নিয়ে মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব প্রতি বছরের পরিচিত দৃশ্য। গ্রামের বাড়ি যাওয়ার বাসে দিতে হয় অতিরিক্ত ভাড়া। উৎসবের আনন্দ তাদের কাছে পৌঁছায় কিনা সেটা ভাবলে বুকটা ভারী হয়ে আসে।
রাষ্ট্রের দায়
শ্রম আইন আছে, শ্রম আদালত আছে, শ্রম মন্ত্রণালয় আছে। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিক তার অধিকার আদায় করতে গেলে কতটা সুবিধা পান? আইনের ফাঁকফোকর, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, মালিকপক্ষের প্রভাব এই সব মিলিয়ে একজন সাধারণ শ্রমিকের পক্ষে লড়াই করা অনেক কঠিন। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে শ্রমিকের উন্নতি মানে দেশের উন্নতি। মজুরি বাড়লে ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। শুধু শিল্পমালিকের স্বার্থ রক্ষা করে দেশ এগোতে পারে না।
মে দিবসের প্রতিশ্রুতি
১৩৭ বছর আগে শিকাগোর শ্রমিকেরা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন মর্যাদার সাথে কাজ করা, ন্যায্য মজুরি পাওয়া, নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাওয়া সেই স্বপ্ন আজও পুরোপুরি পূরণ হয়নি। বাংলাদেশে নয়, অনেক দেশেই নয়।
মে দিবস শুধু মিছিল আর ছুটির দিন নয়। এই দিনটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শ্রমিকের হাতে তৈরি পোশাক আমরা পরি, যে কৃষকের ঘামে উৎপাদিত ভাত আমরা খাই তার জীবনের দিকে একবার ফিরে তাকানোর সময় এসেছে।
লাল পতাকা উঠুক, স্লোগান উঠুক । কিন্তু তার সাথে উঠুক শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি, প্রকৃত মর্যাদা।

মোঃ তায়ীম খান
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ,গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
