প্রকাশিত: ৩০ মার্চ ২০২৬, ০১:১১ পিএম
আহসান রনি: বিশ্বের নানা দেশ আজ সমুদ্র রক্ষায় নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। কারণ তারা বুঝে গেছে-সমুদ্র শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, এটি অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জীববৈচিত্র্যের মূলভিত্তি। বাংলাদেশের জন্যও এই অভিজ্ঞতা ও মডেলগুলো অত্যন্ত মূল্যবান। সমুদ্র দূষণ থামাতে হলে আমাদেরকে বৈশ্বিক শেখাগুলোকে স্থানীয় বাস্তবতায় রূপ দিতে হবে-এখনই, দেরি না করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কি করছে সমুদ্র রক্ষায় তা একটু খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম। কয়েকটি আইডিয়া নিয়ে আমরা এখন থেকেই কাজ করতে পারি।
নরওয়ে তাদের জেলে ও মাছ ধরার নৌকাগুলোকে “ফিশ ফর লিটার” প্রোগ্রামের আওতায় এনেছে। নৌকাগুলো সমুদ্র থেকে যেকোনো বর্জ্য তুলে আনলে সরকার তা গ্রহণ করে এবং উৎসাহ দেয়। এটি একদিকে পরিবেশ রক্ষা করে, অন্যদিকে জেলেদের কাছে সমুদ্রকে পরিষ্কার রাখাকে একটি দায়িত্ব ও সুযোগে পরিণত করে। বাংলাদেশও চাইলে বঙ্গোপসাগরে একই মডেল চালু করতে পারে-যেখানে উপকূলাঞ্চলের মৎস্যজীবীরা প্লাস্টিক সংগ্রহে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
আবার জাপান সিবিচ পরিষ্কারকে জাতীয় সংস্কৃতির অংশ বানিয়েছে। নির্দিষ্ট দিনে লাখো মানুষ দলবদ্ধভাবে সৈকত পরিষ্কারে অংশ নেয়। এটি শুধু পরিবেশগত উদ্যোগ নয়; এটি নাগরিক দায়িত্ব, কমিউনিটির অংশগ্রহণ এবং দেশপ্রেমের অভিব্যক্তি। কক্সবাজার, কুয়াকাটা ও সেন্টমার্টিনকে ঘিরে এ রকম মাসিক জাতীয় সৈকত দিবস তৈরি হলে বাংলাদেশেও একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ার “Trash for Cash” মডেল আরেকটি অনুকরণীয় উদাহরণ। মানুষ প্লাস্টিক জমা দিলে নগদ টাকা বা বাসের টিকিট পায়। এটি কম আয়ের মানুষের জন্য উৎসাহ, আর সরকারের জন্য বর্জ্য সংগ্রহের কার্যকর সমাধান। ঢাকার বস্তি এলাকা, নদীর ধারের সম্প্রদায় এবং পর্যটন অঞ্চলে এ ধরনের উদ্যোগ শুরু করলে প্লাস্টিক প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
বিশ্বজুড়ে তরুণরাও সমুদ্র রক্ষায় উদ্ভাবনী সমাধান দিচ্ছে। কেউ বানাচ্ছে সমুদ্র ভাসমান রোবট, কেউ নদীর মুখে স্বয়ংক্রিয় প্লাস্টিক সংগ্রাহক, কেউ আবার মাইক্রোপ্লাস্টিক ফিল্টার তৈরিতে কাজ করছে। বাংলাদেশের তরুণদেরও একইভাবে উৎসাহ দেওয়া জরুরি-স্টার্টআপ ফান্ড, উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক “Ocean Innovation Lab” গড়ে তোলা এখন অত্যাবশ্যক। সমুদ্র রক্ষার কাজ শুধু সরকারের নয়; এটি যুবশক্তিরও।
বাংলাদেশের সামনে এখন জরুরি তিনটি কাজ-সমুদ্রে যাওয়ার প্রতিটি নদীকে প্লাস্টিকমুক্ত করার জাতীয় পরিকল্পনা নেওয়া, উপকূলীয় এলাকায় কঠোর আইন প্রয়োগ করা এবং নাগরিকদের আচরণে পরিবর্তন আনার সামাজিক প্রচারণা চালানো। সমুদ্রকে বাঁচাতে হলে আমাদের প্রতিদিনের জীবন, আমাদের নীতি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ ভাবনার জায়গাতেই পরিবর্তন আনতে হবে। বিশ্বের উদাহরণগুলো দেখিয়ে দেয়-ইচ্ছা, পরিকল্পনা ও মানুষকেন্দ্রিক উদ্যোগ থাকলে পরিবর্তন সম্ভব। এখন সেই পথ নেওয়ার পালা বাংলাদেশের।
বাংলাদেশের যুব সংগঠনগুলো চাইলে সমুদ্র সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী পরিবর্তন আনতে পারে-নদী ও খাল থেকে শুরু করে উপকূল পর্যন্ত নিয়মিত ক্লিনআপ অভিযান পরিচালনা, প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের জন্য কমিউনিটি-ভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি, জেলেপাড়ায় সচেতনতা ক্যাম্পেইন, পর্যটন এলাকায় “জিরো-প্লাস্টিক জোন” ঘোষণা, স্কুল-কলেজে সমুদ্র বিষয়ক নেতৃত্ব কর্মশালা, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক যুব উদ্ভাবন ল্যাবের মাধ্যমে প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি-এসব উদ্যোগ তরুণরা এখনই নিতে পারে। তাদের শক্তি, সংগঠিত কাজ, সামাজিক মিডিয়া প্রভাব এবং মাঠের সংযোগ-সব মিলিয়ে বাংলাদেশে মহাসাগর রক্ষায় যুবশক্তিই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর চালিকা শক্তি।
লিখেছেন: আহসান রনি, নির্বাহী পরিচালক, মিশন গ্রিন বাংলাদেশ।
