বুধবার ১১, মার্চ ২০২৬

বুধবার ১১, মার্চ ২০২৬ -- : -- --

পরিবার ছাড়া কুবির নবীনদের কেমন কাটছে রমজান

মংক্যএ মার্মা,কুবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০২৬, ১১:১৫ পিএম

ফাইল ফটো

পরিবারকে ছেড়ে প্রথমবারের মতো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) কেমন কাটছে নবীনদের রমজান। এই অভিজ্ঞতা জানতে বিভিন্ন বিভাগের নবীন শিক্ষার্থীদের অনুভূতি জানতে কথা বলেছেন ক্যাম্পাস ২৪ রিপোর্টের কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মংক্যএ মার্মা। নতুন পরিবেশ, নতুন দায়িত্ব আর পরিচিত মানুষদের থেকে দূরে থেকে সংযমের এই মাস কেমন অনুভূতি নিয়ে আসে সেই গল্পই উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের কথায়।

পঞ্চগড়ের ঘর থেকে ক্যাম্পাসের তারাবিহ- এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি: সাহারিয়ার আহমেদ লিটন।

"প্রথমবার ঘরের উঠান পেরিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আমার রমজান এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতির গল্প। পঞ্চগড়ের ঘরে ইফতারের সেই চেনা ডাক আজও কানে বাজে, তবু এই ক্যাম্পাসের সেন্ট্রাল ফিল্ডে  আকাশের নিচে নতুন এক আপনত্ব খুঁজে পাই। সূর্য ডুবলেই বন্ধুদের সঙ্গে বসে ভাগ করে খাওয়া ইফতার, আর নীরব রাতে মসজিদভরা তারাবিহ—এসব মুহূর্তে ক্যাম্পাসটা ধীরে ধীরে হৃদয়ের খুব কাছে চলে আসে। মাঝে মাঝে বুকের ভেতর হাহাকার ওঠে, কিন্তু এই পথই তো স্বপ্নের পথ। পরিবারের দোয়া দূর আকাশের তারার মতো জ্বলজ্বল করে আমাকে আগলে রাখে। বুঝতে শিখছি—দূরত্ব মানেই একা হয়ে যাওয়া নয়, কখনও কখনও তা বড় হয়ে ওঠার শুরু। 

এই রমজান তাই আমার কাছে শুধু সংযমের নয়, অনুভূতি আর আত্মগঠনের এক নীরব কবিতা। শহরের টিউশনি শেষ করে ইফতারের ঠিক ৩ বা ৪ মিনিট আগে পৌছে,  ক্যাফেতে  ইফতারের যে সময়টা শিক্ষা দেয় আমাকে তা শুধুই স্মৃতি পাতায় জমিয়ে রাখার মতোই। সেহেরিতে ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে বিজয় ২৪ হলের ডাইনিং যখন যাই,তখনই মনে হয়,আমি একা নই,আমার মতনই আরো স্বপ্নবাজরা সবাই পরিবার থেকে দুরে, তখন মনে একরাশ সাহস আর তৃপ্তি নিয়ে  খাওয়ার যে দৃপ্ততা তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো না!"

নতুন শহর, নতুন জীবন - তবুও একসাথে ইফতারের বন্ধন; ইরিনা জাহান বলেন, "ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার পর আমার প্রথম রমজান এবার পরিবার ছাড়া কাটাচ্ছি। আমার পরিবার ছাড়া রমজান কিছুটা অসম্পূর্ণ মনে হয়। রমজান আসার আগে থেকেই আম্মুর সাথে ইফতারে কি বানানো হবে তা নিয়ে আলোচনা, কি কি কিনতে হবে সেইসব লিস্ট করা, আলুর চপ বানানো এইসব ব্যাপার গুলো এবার মিস করেছি। প্রতিদিন ইফতারের আগে আম্মুর সেই তোড়জোড় ,রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা পেঁয়াজু ভাজার গন্ধ, বারবার শরবত বানানোর জন্য বলা – মনে হতো কত ব্যস্ততা! অথচ এখন বুঝি, ওই ব্যস্ততার মাঝেই ছিল সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা।

কিন্তু আজ চারপাশে নতুন মুখ, নতুন শহর, নতুন জীবন। তবুও এই একসাথে বসে ইফতার করার মাঝেও এক ধরনের আলাদা বন্ধন তৈরি হয়। কেউ বাসা থেকে আনা পেঁয়াজু শেয়ার করছে, কেউ শরবত বানিয়েছে, কেউ আবার শুধু গল্প দিয়ে সময়টাকে সুন্দর করে দিচ্ছে। মনটা একটু খালি লাগে, কিন্তু একই সাথে গর্বও হয়—নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যাত্রার একটা ধাপ তো এটাই। পরিবার দূরে, কিন্তু তাদের দোয়া আর ভালোবাসা সাথে আছে।"

দূরত্বের মাঝেও নতুন আপনত্ব: রাকিবুল হাসান বলেন, "জীবনের প্রথম রমজান ক্যাম্পাসে, পরিবার থেকে দূরে। ইফতারের সময় আজানের ধ্বনি কানে ভেসে আসলেই বাসার কথা বেশি মনে পড়ে। একসাথে বসে ইফতার করা মানুষগুলো, পরিচিত সেই উষ্ণ মুহূর্তগুলো সব যেন হৃদয়ের ভেতর নীরবে ফিরে আসে।

তবুও নতুন এই জীবনে ধীরে ধীরে অন্যরকম এক আপন অনুভূতি তৈরি হচ্ছে। বন্ধু আর বড় ভাইদের সাথে কাটানো সময়গুলো বুঝিয়ে দিচ্ছে মানুষ দূরে গেলেও আপনত্ব হারায় না, বরং কখনো কখনো নতুন জায়গাতেই আরেকটা পরিবার খুঁজে পাওয়া যায়। ক্যাম্পাসের এই রমজান তাই স্মৃতির পাতায় বিশেষ হয়ে থাকবে। অনুভূতিটা ভিন্ন তবুও গভীরভাবে সুন্দর। "

দূরে থেকেও একই আকাশের নিচে: তাসফিয়া মেহেরুন তানিশা বলেন, "পরিবার ছাড়া প্রথম রমজান এই অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। এতদিন রমজান মানেই ছিল একসাথে সেহরির জন্য ঘুম থেকে ওঠা, মায়ের ডাকে তাড়াহুড়ো করে টেবিলে বসা, ইফতারের আগে সবাই মিলে দোয়া করা। ঘরের ভেতর একটা আলাদা প্রশান্তি থাকত। এবার সেহরির টেবিলে বসলে চারপাশে আপন মুখগুলো নেই। মায়ের যত্নভরা ডাক নেই, আব্বুর শান্ত কণ্ঠে দোয়া নেই। ইফতারের আগে রান্নাঘরের ব্যস্ততা দেখা যায় না, বরং নিজের মতো করে  সামলে নিতে হয় সবকিছু। 

মেসের কোলাহলে ঘুম ভাঙে। আগের মতো আর মায়ের নরম ডাকে নয়, অ্যালার্ম আর রুমমেটদের ডাকেই সেহরির প্রস্তুতি শুরু হয়। তাড়াহুড়ো করে হাত-মুখ ধুয়ে ছোট্ট টেবিলে বসি। চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু সেই আপন ঘরের উষ্ণতা নেই। তবুও দূরত্ব মানেই বিচ্ছিন্নতা নয়। একই আকাশের নিচে, ভিন্ন শহরে থেকেও আমরা একই সময়ে রোজা রাখি, একই আজানের সুরে ইফতার করি, একই প্রার্থনায় হাত তুলি। এই ভাবনাটাই এক অদৃশ্য সেতুর মতো কাজ করে—দূরে থেকেও কাছাকাছি থাকার অনুভূতি দেয়। পরিবার ছাড়া প্রথম রমজান আমাকে বুঝিয়েছে—পরিবারের উপস্থিতি কত বড় নিয়ামত। ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই কত মূল্যবান।"

Link copied!