রবিবার ১৮, অক্টোবর ২০২৬

রবিবার ১৮, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

হাইকোর্টের রিট উপেক্ষা করে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকে লাইসেন্স দিল প্রশাসন

মৌলভীবাজার থেকে রাজন হোসেন তৌফিক

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৬ এএম

ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট

মৌলভীবাজারে মনু নদীর বালু এখন সোনার চেয়ে দামি। আর সেই সোনা লুটে প্রশাসনকে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা কাউসার আহমেদের বিরুদ্ধে। হাইকোর্টে মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও তাকে বারবার বালু   স্তূপ নেওয়ার অনুমোদন দিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে জেলা প্রশাসন। ভুক্তভোগী বৈধ ইজারাদার এখন নিঃস্ব।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনু নদীর আখাইলকুরা বালু মহাল। মৌজা- আখাইলকুরা, কামালপুর মৌজা, খতিয়ান নং ১, জে এল নং ৪৯, দাগ নং ১৩২২, ১৩২৩, ১৩২৪, ১৩২৫ সহ একাধিক দাগ। ১৪৩০ বাংলা সনের বৈধ ইজারাদার ছিলেন স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী মনাই মিয়া। গত ৫ বছর ধরে তিনি নিয়মিত সরকারকে রাজস্ব দিয়ে বৈধভাবে ব্যবসা করে আসছেন। তার উত্তোলিত প্রায় ৬ লক্ষাধিক ঘনফুট বালু স্তূপ করে রাখা ছিল নিজস্ব ডাম্পিং জোনে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী নেতা কাউসার আহমেদ এই বালু মহালের দিকে নজর দেন। মনাই মিয়াসহ ইজারাদার ঘুষ দিতে অস্বীকার করায় ষড়যন্ত্র শুরু হয়।

২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল মাত্র ৬০ হাজার টাকা অতিরিক্ত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বালু আনার অজুহাত দেখিয়ে আখাইলকুরার বৈধ বালু মহালটি জব্দ করে প্রশাসন। জব্দকৃত বালুর পরিমাণ ছিল ৬ লক্ষ ৬ হাজার ৫৬৬ ঘনফুট। এরপর ২২ জুন ২০২৪ সালে সেই জব্দকৃত বালু ১৫ দিনের শর্ত সাপেক্ষে নিলামে তোলা হয়। অভিযোগ, নিলাম প্রক্রিয়ায় বৈধ মালিককে বঞ্চিত করে কাউসার আহমেদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ১৫ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও একই মহাল থেকে আরও ৩ বার বালু নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয় কাউসারকে।

ন্যায়বিচার না পেয়ে বৈধ মালিক মনা মিয়া মহামান্য হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। মামলা নং ১০২৮৯/২০২৪। হাইকোর্ট রুল জারি করেন এবং মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। আগামী ডিসেম্বর ২০২৬ এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে বলে আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে।

আইন অনুযায়ী, হাইকোর্টে রুল জারি থাকা অবস্থায় ওই সম্পত্তির বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কথা। কিন্তু প্রশাসন সেই রুলকে উপেক্ষা করে আবারও একই ব্যক্তিকে ৫ দিনের জন্য বালু স্তূপ নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। 

এবার সরাসরি কাউসার আহমেদের নাম এড়াতে কৌশল নেওয়া হয়েছে। কাউসার নিজে পলাতক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মামলার আসামি হওয়ায় তার পক্ষে ঢাকার এক ব্যবসায়ী ফয়েজ আহমেদকে সামনে আনা হয়েছে। কাগজে-কলমে অনুমোদন কাউসারের নামে হলেও মাঠে বালু লুটছে ফয়েজ আহমেদ। 

ভুক্তভোগীর আরও অভিযোগ, ফয়েজ আহমেদ ৫ দিনের অনুমোদন নিয়ে কাগজ জালিয়াতি করে ১৫ দিনের জন্য অবৈধভাবে বালু স্তূপ  নেওয়ার পাঁয়তারা করচ্ছে ।

এ বিষয়ে ফয়েজ আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনে কোন পত্রিকার সাংবাদিক, সেটা নিবন্ধন আছে নি। আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। এক পর্যায়ে হুমকি দিয়ে ফোন কেটে দেন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মনা মিয়া বলেন, আমি একজন বৈধ বালু ব্যবসায়ী। প্রতি বছর ২-৪ টা মহাল ডাক আনি। সরকারকে ট্যাক্স দেই। তিন বছর আগে আখাইলকুরা মৌজা বৈধভাবে ডাক আনি। আওয়ামী লীগের নেতাদের ঘুষ না দেওয়ায় আমার মাল জব্দ করে। আমি তখন ঢাকায় ছিলাম। আমার মাল আমি না জানা অবস্থায় নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। আমি কামালপুর ভূমি অফিসারকে ফোন দিলে তিনি বলেন, তোমার মাল তোমাকেই দেওয়া হবে। পরে আমার সাথে চরম প্রতারণা করা হয়। বিগত দুই বছর ধরে ডিসি অফিস, সদর ইউএনও অফিস, ভূমি অফিসে ঘুরে ঘুরে জুতা ক্ষয় করছি। স্যাররা ভালো সুর দেন না। এখন পর্যন্ত আমার প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা ক্ষতি। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি।

বালু রাখার জায়গার মালিকের ভাতিজা সাচ্চু মিয়া বলেন, আমার চাচার জায়গার উপরে বালু রাখা হয়েছিল। চুক্তির মেয়াদ শেষ, ভাড়ার টাকাও দেয়নি। এখন জোর করে বালু নিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাজিব হোসেন বলেন, দুই বছর আগের মামলা, ১০২৮৯ নম্বর মামলাটি ডিসমিস হয়ে গেছে, তাই ৫ দিনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বালু নেওয়ার জন্য কাউসার আহমদকে। যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, হাইকোর্টে মামলা বিচারাধীন থাকা ও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা এবং বৈষম্যবিরোধী মামলার আসামিকে বারবার কেন অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, তখন তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) স্যার এই বিষয়ে বলতে পারবেন।

একই প্রশ্নে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোসা. শাহীনা আক্তার বলেন, মামলা ডিসমিস হয়ে গেছে, তাই ৫ দিনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পলাতক নেতাকে বারবার সুবিধা দেওয়ার প্রশ্নে তিনিও একইভাবে বলেন, এটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলতে পারবেন।

দুই শীর্ষ কর্মকর্তার এমন পরস্পরবিরোধী ও দায় এড়ানো বক্তব্যে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। একজন পলাতক আসামি কীভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় থেকে বারবার অনুমোদন পায়, তা এখন মৌলভীবাজারের টক অব দ্য টাউন।

Link copied!